Loading...

ডিআরএএম বাজারেও তৈরি হয়েছে ঘাতটি
এআইয়ের প্রতিযোগিতার প্রভাব এখন আর শুধু বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ডেটা সেন্টার বা শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। যে মেমোরি চিপে একটি এআই সার্ভার হাজার হাজার তথ্য প্রক্রিয়া করছে, একই ধরনের প্রযুক্তির অংশ ব্যবহার করছে আপনার ফোন ও ল্যাপটপও। বিশ্ববাজারে সেই চিপের জন্য প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, সাধারণ ভোক্তা বাজারে চাপও তত বাড়তে পারে।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর জন্য মেমোরি চিপের চাহিদা বাড়ছে। সরবরাহকারীরা সার্ভার ও এআই ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় সাধারণ কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের জন্য ব্যবহৃত চিপের সরবরাহ চাপে পড়েছে। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে মেমোরির দাম বাড়ছে, আর বাংলাদেশে তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আমদানি কর ও পরিবহন ব্যয়
আপনার পরের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের দাম বাড়ার কারণ হয়তো শুধু নতুন ক্যামেরা, দ্রুত প্রসেসর কিংবা উন্নত নকশা হবে না। এর পেছনে থাকতে পারে এমন একটি জিনিস, যেটি সাধারণ ক্রেতা খুব কমই আলাদাভাবে ভাবেন—মেমোরি চিপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালানোর জন্য বিশ্বজুড়ে যে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে, সেখানে উচ্চক্ষমতার মেমোরির চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে একই চিপ তৈরির সক্ষমতা নিয়ে এখন এআই সার্ভার ও সাধারণ ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই চাপ আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। মেমোরি শিল্প বিশ্লেষক ট্রেন্ডফোর্সের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই সার্ভারের চাহিদা ও বড় ক্লাউড কোম্পানিগুলোর ক্রয় অব্যাহত থাকায় ডিআরএএম বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মেমোরি নির্মাতারা উচ্চক্ষমতার সার্ভার ডিআরএএম ও এইচবিএমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নতুন কারখানার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে না বলে এই ঘাটতি আগামী বছরও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিআরএএম হলো এমন মেমোরি, যা কম্পিউটার বা ফোনে চলমান কাজের তথ্য সাময়িকভাবে ধরে রাখে। আর ন্যান্ড ফ্ল্যাশ ব্যবহৃত হয় ফোন, এসএসডি ও অন্যান্য যন্ত্রের তথ্য সংরক্ষণে। এআইয়ের বড় মডেল চালানো ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় বিপুল পরিমাণ দ্রুতগতির মেমোরি দরকার। তাই মেমোরি প্রস্তুতকারকেরা যত বেশি উৎপাদন ক্ষমতা এআই ও ডেটা সেন্টারের দিকে সরাচ্ছেন, ততই সাধারণ ফোন ও পিসির জন্য ব্যবহৃত মেমোরির সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। ট্রেন্ডফোর্সের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এআই-চালিত সার্ভারের কারণে ভোক্তা পর্যায়ের ডিআরএএমের সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং স্মার্টফোন ও নোটবুক নির্মাতারা খরচ সামলাতে কম ধারণক্ষমতার মেমোরির দিকে যেতে বাধ্য হতে পারেন।
দামও সে অনুযায়ী বাড়ছে। ট্রেন্ডফোর্সের ২৪ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে সাধারণ ডিআরএএমের চুক্তিমূল্য আরও বাড়বে এবং ন্যান্ড ফ্ল্যাশের দামও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই অবকাঠামোর জন্য বড় ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা এবং উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ সার্ভার খাতে চলে যাওয়াই এই চাপের অন্যতম কারণ।
স্মার্টফোন বাজারে এর প্রভাবের পরিমাণও এখন অনুমান করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে স্মার্টফোনের গড় বিক্রয়মূল্য প্রায় ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৫৮১ ডলারে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্মার্টফোন সরবরাহ ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমে মাত্র ১০০ কোটির কিছু বেশি ইউনিটে নামতে পারে। আইডিসির হিসাবে, এক বছর আগের তুলনায় মেমোরির খরচ প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে এবং কমদামের ফোনে মেমোরির ব্যয় এখন যন্ত্রটির মোট উপাদান খরচের ৬৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
এখানেই সমস্যাটি সাধারণ ক্রেতার কাছে পৌঁছে যায়। একটি ফোনে মেমোরির খরচ বাড়লেও কোম্পানি সরাসরি পুরো বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপাবে—এমন নয়। প্রতিষ্ঠান চাইলে লাভের পরিমাণ কমিয়ে দাম আগের কাছাকাছি রাখতে পারে। কিন্তু কমদামের ফোনের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। আইডিসি বলছে, সাশ্রয়ী ফোনের নির্মাতারা ইতিমধ্যে কম ধারণক্ষমতার মেমোরি ব্যবহার, কম মডেল আনা এবং তুলনামূলক বেশি দামের ফোনের দিকে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছে। ফলে একই বাজেটে আগে যে ফোন পাওয়া যেত, ভবিষ্যতে সেটির মেমোরি বা স্টোরেজ কম হতে পারে, আবার একই ক্ষমতার ফোন কিনতে বেশি খরচও হতে পারে।
ল্যাপটপের ক্ষেত্রেও একই চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রেন্ডফোর্স ৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, ডিআরএএম ও এসএসডির দাম বাড়ার কারণে নোটবুক নির্মাতাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে যন্ত্রাংশ কিনে মজুত করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ শুধু র্যামের দাম নয়, ল্যাপটপের স্টোরেজ ব্যবস্থার খরচও চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশের বাজারে এর কিছু প্রাথমিক লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ঢাকার কম্পিউটার বাজারের সেপ্টেম্বরের শুরুতে করা বাজার পর্যবেক্ষণে কয়েকটি র্যাম মডেলের দাম এক সপ্তাহেই ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেড়েছে বলে স্থানীয় বিক্রেতারা জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরের বর্তমান খুচরা তালিকায় ৮ জিবি ডিডিআর৪ র্যামের বিভিন্ন মডেলের দাম প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ৮০০ টাকা বা তারও বেশি দেখা যাচ্ছে; ব্র্যান্ড ও মডেলভেদে দাম যথেষ্ট আলাদা। এসব খুচরা দাম সরাসরি বৈশ্বিক এআই-চাহিদার কারণে বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না, তবে বৈশ্বিক মেমোরি সংকটের সময়ে স্থানীয় বাজারেও দামের চাপ রয়েছে।
বাংলাদেশি ক্রেতার ক্ষেত্রে আরও একটি আলাদা চাপ আছে। ১ জুলাই থেকে আমদানি করা মোবাইল ফোনের সাময়িক শুল্ক-সুবিধা শেষ হওয়ায় কার্যকর করভার প্রায় ৪৩ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশে উঠেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন। এতে বিশ্ববাজারে যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার প্রভাবের সঙ্গে স্থানীয় করভারও যুক্ত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে একই ফোনের উৎপাদন খরচ বাড়লে বাংলাদেশে তার খুচরা দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
তবে বাজারের এই সংকট থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। এটি শুধু ‘এআই বাড়ছে, তাই ফোনের দাম বাড়ছে’ এত সরল সমীকরণ নয়। স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের দামের ওপর প্রসেসর, পর্দা, ব্যাটারি, পরিবহন, মুদ্রার বিনিময় হার, কর ও কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশল সবকিছুর প্রভাব থাকে। একই সময়ে কিছু নির্মাতা দাম বাড়ানোর বদলে কম মেমোরির সংস্করণ বাজারে আনতে পারেন। ফলে ক্রেতার ক্ষতি সব সময় সরাসরি বেশি দাম দিয়ে হবে না; কখনো একই দামে কম ক্ষমতার যন্ত্র কিনতে হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে এবং চীনের নতুন ডিআরএএম উৎপাদন সক্ষমতা ভবিষ্যতে সরবরাহ বাড়াতে পারে। আবার ট্রেন্ডফোর্সের বর্তমান মূল্যায়ন বলছে, এআই সার্ভারের চাহিদা এবং উৎপাদন সক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে অন্তত আগামী বছর পর্যন্ত বাজারে চাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ এআইয়ের প্রতিযোগিতার প্রভাব এখন আর শুধু বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ডেটা সেন্টার বা শেয়ারবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। যে মেমোরি চিপে একটি এআই সার্ভার হাজার হাজার তথ্য প্রক্রিয়া করছে, একই ধরনের প্রযুক্তির অংশ ব্যবহার করছে আপনার ফোন ও ল্যাপটপও। বিশ্ববাজারে সেই চিপের জন্য প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, সাধারণ ভোক্তা বাজারে চাপও তত বাড়তে পারে।
ফলে আপনার পরের ফোন বা ল্যাপটপ শুধু নতুন প্রযুক্তির জন্য নয়, এআই অবকাঠামোর বাড়তি খরচের কারণেও বেশি দামি হতে পারে। আর দাম না বাড়লেও একই বাজেটে কম মেমোরি বা কম স্টোরেজের যন্ত্র হাতে পাওয়ার সম্ভাবনাটিও এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নবোদয়/ আরআই/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬