Loading...

ব্রাজিলে ক্ষমতার দুই লড়াই
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তারমধ্যে ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে থাকা ভোটের ব্যবধান ঘোচানো একটি। দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি হলো- প্রতিপক্ষের দল শক্তিশালী হয়ে ওঠা কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সরকার চালানো।


ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তারমধ্যে ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে থাকা ভোটের ব্যবধান ঘোচানো একটি। দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি হলো- প্রতিপক্ষের দল শক্তিশালী হয়ে ওঠা কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সরকার চালানো। ফলে ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফায় লুলা ঘুরে দাঁড়ালেও রাজনৈতিক চাপ শেষ হবে না। প্রেসিডেন্ট পদে কে বসবেন, তার পাশাপাশি ক্ষমতা কতটা ব্যবহার করতে পারবেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
রবিবার (৪ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ভোটে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ গণনা শেষে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ, বামপন্থি লুলা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। ব্রাজিলের উচ্চতর নির্বাচনি আদালতের হিসাবে ব্যবধান প্রায় ২২ লাখ ২৮ হাজার ভোট, বা ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ পয়েন্ট। কেউ বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
এই ফলের তাৎপর্য বুঝতে ২০২২ সালের দিকে তাকানো দরকার। সেবার প্রথম দফায় লুলার ভোট ছিল ৪৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ, জইর বলসোনারোর ৪৩ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ লুলা এগিয়েছিলেন ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ পয়েন্টে। চার বছর পর সেই সুবিধা উল্টে গেছে।
ফ্লাভিওর অগ্রগতি বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের স্থায়িত্বও দেখাচ্ছে। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর অভ্যুত্থানচেষ্টার মামলায় জইর বলসোনারোর ২৭ বছর তিন মাসের কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু তার ছেলে এখন প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে। অর্থাৎ নেতার বিরুদ্ধে আদালতের রায় তার রাজনৈতিক ধারাকে নির্বাচনিভাবে নিষ্ক্রিয় করেনি। এটিকে আদালতের রায়ের পক্ষে বা বিপক্ষে গণরায় বলা অবশ্য অতিরঞ্জন হবে; ভোটাররা একাধিক বিবেচনায় ভোট দেন।

আরও স্থায়ী পরিবর্তন ঘটেছে কংগ্রেসে। প্রতিনিধি পরিষদের সরকারি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি পেয়েছে ১২১ আসন। লুলার ওয়ার্কার্স পার্টিসহ তিন দলের ফেডারেশন পেয়েছে ৮২ আসন। ফেডারেশনের হিসাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ: শুধু লুলার নিজের দলের সঙ্গে প্রতিপক্ষের তুলনা করলে তার দলীয় মিত্রদের উপস্থিতি আড়াল হয়। তবে এই ফেডারেশনের বাইরেও সম্ভাব্য সহযোগী রয়েছে; সেটি মাথায় রেখেই পরবর্তী জোটের শক্তি বিচার করতে হবে।
সিনেটেও লিবারেল পার্টির অবস্থান শক্তিশালী। দলটি এবার ১৯ জন সিনেটর নির্বাচিত করেছে; আগের নয়জনসহ পরের মেয়াদে তাদের সদস্য হবে ২৮ জন। ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য থাকবেন নয়জন। তাই লিবারেল পার্টি এবারই ২৮ আসন জিতেছে বলা ভুল। নতুন নির্বাচিত সদস্য এবং পুরো দলীয় প্রতিনিধিত্ব আলাদা হিসাব। এই পার্থক্য বাদ দিলে রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তনের ছবিটিও ভুল হতে পারে।
এখানে সময়ের হিসাবও জরুরি। নবনির্বাচিত সিনেটরদের মেয়াদ আট বছর। ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব পরবর্তী প্রেসিডেন্টের একটি মেয়াদের বাইরেও চলবে। এই কারণেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নাটকীয়তার আড়ালে সিনেটের ফলকে গৌণ হিসেবে দেখা ভুল হবে। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি তৈরি করা আলাদা প্রক্রিয়া; ফ্লাভিওর দল দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিতেও এগিয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় দল হওয়া আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিনিধি পরিষদের ৫১৩ এবং সিনেটের ৮১ আসনের কোনোটিতেই লিবারেল পার্টি একা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। ফলে ফ্লাভিও জিতলেও অন্য দলের সমর্থন লাগবে। আর লুলা জিতলে শক্তিশালী বিরোধী দলকে মোকাবিলার পাশাপাশি মধ্যপন্থি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে দরকষাকষির প্রয়োজন বাড়তে পারে। কংগ্রেসের ফল এই সম্ভাবনা তৈরি করেছে; চূড়ান্ত জোটের আচরণ এখনই নির্ধারণ করে দেয়নি।
সিনেটের গুরুত্ব শুধু আইন পাসে সীমিত নয়। প্রেসিডেন্টের মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে অন্তত ৪১ সিনেটরের অনুমোদন লাগে। ফল ঘোষণার পর ফ্লাভিও তার সম্ভাব্য সরকারের বিচারপতি নিয়োগের পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ফলে প্রেসিডেন্ট পদ ও সিনেটের শক্তি একসঙ্গে বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বড় দলীয় উপস্থিতি নিজে থেকেই আদালতের নিয়ন্ত্রণ বা যেকোনো নিয়োগ নিশ্চিত করে না।

লুলার নির্বাচনি সমস্যার আরেকটি দিক দৈনন্দিন জীবনের চাপ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতাকে প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা হয়েছে। বেকারত্ব ও বৈষম্য কমলেও উচ্চ ব্যয় এবং পারিবারিক ঋণের উদ্বেগ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে। এর রাজনৈতিক পাঠ হলো, সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির পরিসংখ্যানকে মানুষের ব্যক্তিগত স্বস্তির সমার্থক ধরে নেওয়া চলে না। তবে এসব উদ্বেগের কোনটি কত ভোট বদলেছে, প্রথম দফার ফল সেই উত্তর দেয় না।
দ্বিতীয় দফায় দুই প্রধান প্রার্থীর বাইরে থাকা ভোট নিয়ে প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাদের সম্মিলিত ভোটের বাইরে রয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ বৈধ ভোট। তৃতীয় হওয়া অগাস্তো কুরি পেয়েছেন ২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। কিন্তু বাদ পড়া প্রার্থীর সমর্থন ঘোষণা মানেই তার সব ভোট স্থানান্তর নয়। অনুপস্থিত ভোটারকে কেন্দ্রে আনা, নিজের সমর্থন ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের ভোট টানাও ফল বদলাতে পারে। মোট ভোটও বদলাতে পারে।
ফল ঘোষণার পর লুলা স্বীকার করেছেন, প্রথম দফাতেই জয়ের আশা করেছিলেন তিনি; এখন নতুন প্রচার শুরু করবেন। এই স্বীকারোক্তির তাৎপর্য হলো, ক্ষমতাসীন শিবিরকে ভোটারের সমর্থন সম্পর্কে আগের অনুমান পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। শুধু প্রার্থীর পরিচিতি বা অতীত সাফল্যের ওপর ভর করে পরের ধাপ পার হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
লুলার জন্য তাই প্রচার নতুন করে সাজানোর অর্থ শুধু আরও সমাবেশ নয়। নিজের রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থাকা ভোটারকে বোঝাতে হবে, আরেক মেয়াদে তাদের জীবন কীভাবে সহজ হবে এবং বিভক্ত কংগ্রেসে তিনি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন কীভাবে। ফ্লাভিওর ক্ষেত্রেও শুধু সরকারবিরোধী অসন্তোষ যথেষ্ট নয়; পরিবর্তনের দাবি থেকে বিশ্বাসযোগ্য শাসনপরিকল্পনায় যাওয়ার পরীক্ষা রয়েছে।
এখনই ব্রাজিলের চূড়ান্ত ডানমুখী পালাবদল ঘোষণা করা যাবে না। প্রথম দফা ফ্লাভিওকে সুবিধা দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট পদ দেয়নি। কিন্তু কংগ্রেসের ফল ইতিমধ্যে পরবর্তী সরকারের ক্ষমতার পরিবেশ বদলেছে। দ্বিতীয় দফায় লুলার সম্ভাব্য জয়ও সেই সংসদীয় বাস্তবতা মুছে দেবে না। ব্রাজিলের সামনে তাই শুধু কে জিতবেন, সেই প্রশ্ন নয়; যে জিতবেন, তিনি কাদের সমর্থনে এবং কতটা কার্যকরভাবে শাসন করবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬