Loading...

ঋণ ও মানসিক বিপর্যয়ের গল্প
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টা পর স্বজনেরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তাঁকে শনাক্ত করেন। জানা যায়, তিনি রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত তন্ময়ী মণ্ডল।


তন্ময়ী মণ্ডল, পেশায় ছিলেন নার্স। মানুষের অসুস্থতা, যন্ত্রণা আর বেঁচে ফেরার লড়াই ছিল তাঁর কর্মজীবনের পরিচিত দৃশ্য। অথচ মাত্র ২৮ বছর বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বাথরুম থেকে উদ্ধার হলো তাঁর নিথর দেহ। এক দিন আগে মারা গিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আকাশ মিত্র। দুটি মৃত্যুর কারণ হিসাবে এখন সামনে আসছে সম্পর্কের জটিলতা, ঋণের চাপ এবং গভীর মানসিক বিপর্যয়ের কথা।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টা পর স্বজনেরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তাঁকে শনাক্ত করেন। জানা যায়, তিনি রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত তন্ময়ী মণ্ডল।
তন্ময়ীর বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ঐচার মাঠ গ্রামে। মৃত বিভূত মণ্ডলের দুই মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ঢাকায় চাকরি করতেন এবং আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের হোস্টেলে থাকতেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তাঁর নিজের জীবন ও স্বপ্নের পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও দায়িত্ব ছিল। কিন্তু স্বজনেরা তাঁর মনের ভেতরে চলতে থাকা সংকটের গভীরতা হয়তো বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি।
ছোট বোন তন্দ্রা মণ্ডলের ভাষ্য, প্রায় এক বছর আগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার আকাশ মিত্রের সঙ্গে তন্ময়ীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আকাশ বিবাহিত ছিলেন—তন্ময়ী শুরুতে বিষয়টি জানতেন না বলে দাবি পরিবারের। পরে তা জানার পর সম্পর্কটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আকাশ তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলেও জানিয়েছেন তন্দ্রা।
পুলিশ জানিয়েছে, আর্থিক সংকট ও ঋণে জর্জরিত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন আকাশ মিত্র। মৃত্যুর আগে লেখা একটি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই।’। রোববার তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া চিঠিতে অর্থসংকটের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি তন্ময়ী তাঁর কাছে টাকা পাবেন বলেও লিখেছিলেন তিনি। আকাশের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলেও চিঠিতে লেখা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আকাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ঢামেক হাসপাতালে চলে আসেন তন্ময়ী। ময়নাতদন্তের জন্য আকাশের মরদেহ সেখানেই আনা হয়েছিল। স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, তন্ময়ী দীর্ঘ সময় মরদেহের আশপাশে ছিলেন। পরদিন একই হাসপাতাল থেকে তাঁর নিজের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাশে পাওয়া ব্যাগ থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে আকাশের মৃত্যু মেনে নিতে না পারা এবং আর বাঁচতে না চাওয়ার কথা লেখা ছিল।
তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের সামনে রক্তের দাগ ও একটি রক্তমাখা ছুরি পাওয়া যায়। প্রথমে বিষয়টিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ বস্তুটি জব্দ করে এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা শুরু করে। ফুটেজে তন্ময়ীকে হাসপাতালের ভেতরে একা হাঁটতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসাইন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মানসিক বিপর্যয় থেকে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর কবজির ক্ষত, উদ্ধার করা চিরকুট, ছুরি ও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই দুই মৃত্যুকে শুধু একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প হিসেবে দেখলে আসল সংকট আড়াল হয়ে যাবে। এখানে রয়েছে ঋণের চাপ, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, প্রতারণার অভিযোগ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দুই তরুণ-তরুণীর সহায়তা না পাওয়ার গল্প।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬