Loading...

সরকারি নিয়োগে যাচাই-বিতর্ক
লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পেরিয়ে পিএসসির সুপারিশ পাওয়া শেষ কথা হচ্ছে না। নিয়োগের শেষ ধাপে বাদ পড়ছেন প্রার্থীরা, অথচ অভিযোগ ও প্রতিকারের পথ অনেকের কাছে অজানা। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ৫৭ জনের নাম প্রজ্ঞাপনে না থাকায় আবার সেই একই প্রশ্ন উঠেছে।


লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পেরিয়ে পিএসসির সুপারিশ পাওয়া শেষ কথা হচ্ছে না। নিয়োগের শেষ ধাপে বাদ পড়ছেন প্রার্থীরা, অথচ অভিযোগ ও প্রতিকারের পথ অনেকের কাছে অজানা। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ৫৭ জনের নাম প্রজ্ঞাপনে না থাকায় আবার সেই একই প্রশ্ন উঠেছে। যাচাই কি যোগ্যতা নিশ্চিত করছে, নাকি রাজনৈতিক বাছাইয়ের সুযোগ রেখে দিচ্ছে?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) শিক্ষা ক্যাডারে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। পিএসসি সাময়িকভাবে সুপারিশ করেছিল ৬৬৮ জনকে। বাদ পড়া ৫৭ জনের ব্যক্তিভিত্তিক কারণ প্রকাশ্যে জানা যায়নি। ফলে সবাই একই কারণে বাদ পড়েছেন, কিংবা প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এই অনিশ্চয়তার মানবিক মূল্য সামনে এনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. জসিম উদ্দীন। ফেসবুক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, সুপারিশ পাওয়ার পর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও বোনদের পড়াশোনার দায়িত্ব তার ওপর। নিয়োগ না পাওয়ায় তীব্র হতাশা জানিয়েছেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেও একই ধরনের সংকট হয়েছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ১১ জেলার শিক্ষা কার্যালযের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। তাতে দেখা যায়, ৫৫৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। আন্দোলন ও সমালোচনার মধ্যে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। নওগাঁয় রবিবার নতুন করে ৬১ জন নিয়োগপত্র পান বলে জেলা শিক্ষা অফিসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস।

তবে সবার বাদ পড়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হয়েছে—এমনটি এখনো নিশ্চিত নয়। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, যাচাই ও পদায়ন ১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এরপরও নিয়োগপত্র না পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমাধান করা হবে। তার বক্তব্য, যোগ্য প্রার্থীরা বিধিমালা অনুযায়ী সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ পুনর্বিবেচনা চলছে, সবার নিষ্পত্তি নিশ্চিত হয়নি।
৪৩তম বিসিএসেও একই বৃত্ত দেখা গেছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪-এর প্রজ্ঞাপনে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিরূপ মন্তব্যের কারণে ২২৭ জনকে সাময়িকভাবে অনুপযুক্ত বিবেচনা করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুপস্থিত আরও ৪০ জন ছিলেন আলাদা হিসাবে। আন্দোলন ও পুনর্বিবেচনার পর বাদ পড়াদের মধ্যে ১৬২ জনকে ২০২৫ সালের ২০ মে নতুন প্রজ্ঞাপনে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরও পেছনে গেলে, ২৮ থেকে ৪২তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও নিয়োগ না পাওয়া ২৫৯ জনকে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের আগের ব্যাচ অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়নি। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, আওয়ামী মতাদর্শী না হওয়ায় অনেক প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হয়েছিলেন। ফলে সমস্যাটি এক নিয়োগপর্ব বা এক সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
যাচাইয়ের প্রয়োজন ও রাজনৈতিক ছাঁকনি অবশ্য এক বিষয় নয়। সুপারিশ চূড়ান্ত নিয়োগের নিঃশর্ত নিশ্চয়তা নয়; নির্ধারিত শর্ত যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকারি চাকরিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া রবিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, অপরাধের তথ্য যাচাই করতে পারে পুলিশ; গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থী বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি জনপ্রশাসনকে বিশৃঙ্খল করে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের সভাপতি অধ্যাপক আতিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক যুবাঈর মুহাম্মদ এহসানও সুনির্দিষ্ট কারণ ও আইনগত ভিত্তি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। শনিবার দেওয়া তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, অপরাধ বা আইনগত অযোগ্যতার প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়, বিশ্বাস বা মতপার্থক্যের ভিত্তিতে চাকরিবঞ্চিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তাহলে কি দলীয় লোক নিয়োগের পাঁয়তারা চলছে? বাদ দেওয়ার অভিন্ন মানদণ্ড, নির্দিষ্ট অভিযোগ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অস্পষ্ট থাকলে রাজনৈতিক বাছাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রার্থীর পরিচয়ের চেয়ে সিদ্ধান্তের নথি ও প্রয়োগের সামঞ্জস্য পরীক্ষা জরুরি।
ক্ষতি শুধু চাকরির সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। প্রাথমিকের নিয়োগপ্রার্থীদের সংগঠন জানিয়েছে, অপেক্ষায় কেউ আগের চাকরি ছেড়েছেন, কেউ অন্য সুযোগ নেননি; কারো নতুন আবেদনের বয়সসীমা শেষের পথে। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর অনিশ্চয়তা তাই আয়, পরিবারের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করছে।
তবে ব্যক্তির মানসিক সংকটকে শুধু একটি ঘটনার ফল ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। দলীয় নিয়োগের সংস্কৃতি অনেক আগেই থেকেই আছে। একারণে অনেক মেধাবীরা চাকরি বা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই অনেকেই হতাশ হয়ে বা দেশের নানা অনিয়মের কারণে বিদেশমুখী হচ্ছেন।
বিদেশমুখী প্রবণতাও দৃশ্যমান। আইআইইর ‘ওপেন ডোরস ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ১৫৬; আগের বছর ছিল ১৭ হাজার ৯৯। উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিলেও, তাদের অনেকের উদ্দেশ্য বাইরে স্থায়ী হয়ে যাওয়া।
তবু দেশে যোগ্যতার স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও পেশাগত ভবিষ্যতের আস্থা দুর্বল হলে দক্ষ তরুণদের অন্যত্র সুযোগ খোঁজার প্রবণতা বাড়তে পারে। এটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
শিক্ষামন্ত্রী মেধাবীদের দেশে ফেরানোর নীতির কথা বলছেন। সেই লক্ষ্য পূরণে দেশে থাকা মেধাবীদের ভরসাও প্রয়োজন। বাদ দেওয়ার লিখিত কারণ, নির্দিষ্ট সময়ের পুনর্বিবেচনা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ সেই ভরসার ভিত্তি। পরে নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংশোধন করা যায়; হারানো সময় ও ভেঙে যাওয়া আস্থা ফেরানো অনেক কঠিন।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০১ অক্টোবর ২০২৬