Loading...

ইরানের প্রভাব বাড়ার সুযোগ
ইরানের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা, আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত—সব মিলিয়ে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখে বাগদাদ। এই পালাবদল ঘটছে এমন সময়ে, যখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।


দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরাকের নিরাপত্তা সমীকরণে বড় একটি ছায়া হয়েছিল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি। সেই অধ্যায় এখন শেষ। কিন্তু মার্কিন সেনারা সরে গেল এমন একসময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য নিজেই নতুন করে অস্থিরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সবকিছুকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই পালাবদলে ইরাকের সামনে তাই একসঙ্গে কয়েকটি বড় প্রশ্ন। মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা কমে গেলে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক কি আবার মাথা তুলবে? ওয়াশিংটনের প্রভাব কমার জায়গা কি দখল করবে ইরানঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো? নাকি দীর্ঘ বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পর বাগদাদ এবার নিজস্ব নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?
ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইরাকের জন্য শুধু একটি সামরিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। এটি দেশটির নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখার নতুন পরীক্ষার শুরু।
ইরানের প্রভাব বাড়ার সুযোগ
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতে মার্কিন অভিযান শুরুর পর ইরাক ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। ২০১১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলেও ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের পর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে তারা আবার ফিরে আসে। ২০২৪ সালে বাগদাদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে এবার প্রত্যাহার সম্পন্ন হলো।
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সেনাদের বিদায়কে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। তেহরানের সঙ্গে ইরাকের দীর্ঘ সীমান্ত, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দেশটিতে ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি ইরানের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মানেই ইরাকের ওপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়। বাগদাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং কুর্দি নেতৃত্বের অবস্থানও দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও অব্যাহত থাকতে পারে।

আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কা
ইরাকের নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ আইএসের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক। ২০১৭ সালে দেশটিতে সংগঠনটির ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটলেও বিচ্ছিন্ন সদস্য ও গোপন সেলগুলোর তৎপরতার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
মার্কিন বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হলে আইএসের গতিবিধি শনাক্ত করা এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। কুর্দি কর্মকর্তারাও সামরিক সহায়তা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তবে আইএসের পুনরুত্থান অবশ্যম্ভাবী নয়। ইরাকি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় অব্যাহত রাখা গেলে ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। পাশাপাশি সংঘাতপ্রবণ এলাকায় কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা ও জঙ্গিগোষ্ঠীর নতুন সদস্য সংগ্রহের সুযোগ কমানোও জরুরি।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি নিরাপত্তা
ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হলে তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় ও বিশ্ববাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়।
২৮ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং সংঘাতের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের যোগাযোগের কথা উঠে আসে। কাতারও এ প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখছে। তবে নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য সমঝোতাকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইরাকের তেল রপ্তানি ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দেশটির অর্থনীতি তেল আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় আঞ্চলিক অস্থিরতা উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাগদাদের সামনে কঠিন পরীক্ষা
মার্কিন সেনাদের বিদায়কে এক পক্ষের চূড়ান্ত বিজয় বা অন্য পক্ষের পরাজয় হিসেবে দেখলে পরিবর্তনের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। অন্যদিকে, ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ভূমিকা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে ইরাকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর।
বাগদাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আইএসের বিরুদ্ধে অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা। একই সঙ্গে বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
মার্কিন সেনাদের প্রস্থান ইরাকের জন্য সার্বভৌমত্ব জোরদারের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো সহজ হবে না। শেষ পর্যন্ত দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ওয়াশিংটন বা তেহরানের একক আধিপত্যে নয়, বরং বাগদাদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে তার ওপর।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬