Loading...

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক চাপ
রুয়ান্ডার গণহত্যায় ধর্ষণের শিকার নারীদের ন্যায়বিচার থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগের বিচার—নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন এ দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে। তার শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পরদিন সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎও।


রুয়ান্ডার গণহত্যায় ধর্ষণের শিকার নারীদের ন্যায়বিচার থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগের বিচার—নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন এ দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে। তার শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পরদিন সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎও। পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার সাবেক কর্মস্থল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেখিয়েছে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার এই পথ কতটা রাজনৈতিক চাপের মুখে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দক্ষিণ আফ্রিকার ৮৫ বছর বয়সি আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথাম ‘নাভি’ পিল্লাইকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বেছে নেয় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন এগিয়ে নিতে তার অবদানের কারণেই এই পুরস্কার। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার কাজে তার সাহস, সততা ও স্বাধীন অবস্থানকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছে কমিটি।
এই স্বীকৃতির শিকড় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ১৯৪১ সালে ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম পিল্লাইয়ের। বৈষম্যের মধ্যেই আইন পেশায় এসে তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকারের পক্ষে কাজ করেন। ১৯৯৫ সালে দেশটির হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হন তিনি। একই বছর যোগ দেন রুয়ান্ডার জন্য গঠিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
তার বিচারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ১৯৯৮ সালের জ্যঁ-পল আকায়েসু মামলার রায়। রুয়ান্ডার তাবার সাবেক মেয়রকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা তিন বিচারকের একজন ছিলেন পিল্লাই। ওই রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, কোনো সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাও গণহত্যার উপাদান হতে পারে। যৌন নির্যাতনের শিকার মানুষের সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারকে নতুন ভিত্তি দেয়।

এই অগ্রগতির তাৎপর্য হলো, হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি যৌন সহিংসতার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসের চেষ্টাও আন্তর্জাতিক বিচারে গুরুত্ব পায়। পিল্লাইয়ের অবদান মূল্যায়নে নোবেল কমিটি এই আইনি পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে আট বছর কাজের মধ্যে চার বছর তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির বিচারক ছিলেন।
বাংলাদেশের জন্য তার কর্মজীবনের বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় ২০১৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) অস্থায়ী বা অ্যাডহক বিচারক হিসেবে যুক্ত পিল্লাই। গাম্বিয়া তাকে মনোনীত করলেও বিচারক হিসেবে তিনি কোনো পক্ষের প্রতিনিধি নন; নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন। মামলাটি গণহত্যা সনদের অধীনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায় নিয়ে।
আইসিজে ও আইসিসির কাজও পৃথক। প্রথমটিতে রাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধের বিচার হয়; দ্বিতীয়টিতে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য ব্যক্তির ফৌজদারি দায় বিবেচিত হয়। রোহিঙ্গাদের মামলায় পিল্লাইয়ের অংশগ্রহণ তার দীর্ঘ বিচারিক কাজের ধারাবাহিকতা। নোবেল কমিটিও পুরস্কারের ব্যাখ্যায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের মামলায় তার বর্তমান ভূমিকা উল্লেখ করেছে।
পিল্লাই ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বাধীন স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা করেছে বলে সিদ্ধান্ত জানায়। কমিশন হত্যাকাণ্ড, গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি এবং ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতিতে জীবনযাপন চাপিয়ে দেওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে। এটি তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান ও আইনি মূল্যায়ন; কোনো আদালতের ফৌজদারি দণ্ডাদেশ নয়।
নোবেল কমিটির বক্তব্যে এই দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে বর্তমান সংকটের যোগসূত্র স্পষ্ট। বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে থাকায় তাদের সমর্থনের বার্তা দিয়েছে কমিটি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহি এবং নিপীড়িত মানুষের বিচারপ্রাপ্তি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত। পিল্লাইয়ের নোবেল সেই প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার প্রয়োজনও সামনে এনেছে।

পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার আইসিসিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তোলে ট্রাম্প প্রশাসন। আগের পদক্ষেপগুলো মূলত বিচারক ও কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধে ছিল। নতুন নিষেধাজ্ঞা আদালতকে ব্যাংকিং, বিমা ও প্রযুক্তিসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ঘোষিত যুক্তি, আইসিসিকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেওয়া হবে না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ডের অতীতের তদন্ত নিয়েও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আদালতের বিরোধ রয়েছে।
মার্কিন অর্থ বিভাগের নথিতে আদালতের কিছু কার্যক্রম ও লেনদেন চালিয়ে নেওয়ার জন্য ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় রয়েছে। আইসিসি নিষেধাজ্ঞাকে বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। আদালতের বক্তব্য, এই পদক্ষেপ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাহত এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
নোবেল না পাওয়ার অসন্তোষও আড়াল করেননি ট্রাম্প। শুক্রবার নিউইয়র্কের এক সমাবেশে তিনি পিল্লাইকে ‘অচেনা’ ব্যক্তি বলে মন্তব্য করেন এবং নরওয়ের সমালোচনা করেন। এর মাধ্যমে আদালতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধও পুরোনো বিরোধ আবার সামনে আসছে।
নুরেমবার্গের সম্মেলনে পুরস্কারের খবর শুনে অবশ্য ট্রাম্পকে নিয়ে রসিকতা করেছেন পিল্লাই। অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের প্রকাশ করা ভিডিওতে করতালির মধ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি তালি দেন, তাহলে হয়তো আমি এই পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’
তবে নোবেল কমিটির নিয়মে ঘোষণার পর পুরস্কারের স্বীকৃতি ভাগ বা হস্তান্তর করা যায় না। পদক অন্যের হাতে যেতে পারে, নোবেলজয়ীর পরিচয় থাকে বিজয়ীরই। করতালি যতই বাড়ুক, নোবেলজয়ীর তালিকায় ট্রাম্পের নাম তাতে উঠছে না।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬