Loading...

বাধ্য করা হয় অনলাইন প্রতারণার
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসের সাইবার স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোতে ৮০টির বেশি দেশের মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছেন। এসব কেন্দ্রে মানুষকে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নেওয়া হয় এবং পরে নথিপত্র কেড়ে নিয়ে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়।


কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার কর্মী কিংবা গ্রাহকসেবা কর্মকর্তার চাকরি। মাসে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা বেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনেক বাংলাদেশি। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, কেউ পরিবারের সঞ্চয় ভাঙেন। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে সরকারি ছাড়পত্র নিয়েই পাড়ি জমান কম্বোডিয়ায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেকের সামনে খুলে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। চাকরি নয়, তাঁদের নেওয়া হয়েছে সাইবার প্রতারণার আস্তানায়।
গত দেড় বছরে বাংলাদেশ থেকে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন বলে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদন। তাঁদের মধ্যে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির হিসাবে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে পড়েছেন। জুনে ৫৮৩ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও আরও ৩৮ জন দেশে ফেরেন। একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন বলে ব্র্যাক জানিয়েছে।
ঘটনাগুলোর বর্ণনায় একটি প্রায় একই রকম পথ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে চাকরির বিজ্ঞাপন, স্থানীয় দালাল বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, কয়েক লাখ টাকা পরিশোধ, বিদেশে যাওয়ার কাগজপত্র এবং সরকারি ছাড়পত্র। সবশেষে কম্বোডিয়ায় পৌঁছে বিমানবন্দর থেকে আরেক পক্ষের হাতে তুলে দেওয়া। এরপর পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখা এবং অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার অভিযোগ করেছেন দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিরা।
সিরাজগঞ্জের এক তরুণের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি এবং মাসে ৮০ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ভিসায় পেশা হিসেবে নির্মাণকাজের কথা লেখা ছিল। কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর দুই দিনের মধ্যে তাঁর পাসপোর্ট, কাগজপত্র ও টাকা নিয়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে একটি সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে বিদেশিদের সঙ্গে ভুয়া পরিচয়ে সম্পর্ক তৈরি করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজে বাধ্য করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

আরেক ভুক্তভোগীর বর্ণনায়, কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির জন্য তিনি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ থেকেই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ায় গিয়ে দেখতে পান তাঁর কাছে কাজের অনুমতির বদলে এক মাসের ভ্রমণ ভিসা। পরে তাঁকে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এখানেই বিষয়টি সাধারণ চাকরির প্রতারণার সীমা ছাড়িয়ে মানব পাচারের আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাইবার স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোতে মানুষকে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করার প্রবণতা বাড়ছে। প্রতারকচক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে মানুষ সংগ্রহ করছে। চাকরির নামে বিদেশে নেওয়ার পর তাঁদের অপরাধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিদেশের সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে লোক সরবরাহকারী নিয়োগ নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, আর্থিক তদন্ত এবং আন্তদেশীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ এটি শুধু কম্বোডিয়ার কোনো অপরাধচক্রের সমস্যা নয়; বাংলাদেশ থেকে মানুষ সংগ্রহ করার একটি স্থানীয় নেটওয়ার্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সরকারি ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া নিয়ে। একজন কর্মী যখন জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, তখন তাঁর ভিসার ধরন, নিয়োগকর্তা, চাকরির ধরন ও বাস্তব কর্মস্থল কতটা যাচাই হচ্ছে সেটিই এখন সামনে এসেছে। কারণ ফিরে আসা কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা বাংলাদেশ থেকে একটি চাকরির কথা জেনেছিলেন, কিন্তু বিদেশে গিয়ে ভিন্ন পেশার ভিসা পেয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, বিমানবন্দর থেকেই তাঁদের স্থানীয় দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এই দুর্বলতার কারণে এখন শুধু কম্বোডিয়া নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলো নিয়েও সতর্কতা বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকার কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রাজিলগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের পূর্ণ যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ এত দিন যে প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র যাচাই করে ছাড়পত্র দেওয়া হতো, তার পাশাপাশি কর্মস্থল ও নিয়োগকর্তার বাস্তবতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সমস্যার আন্তর্জাতিক মাত্রাটিও দ্রুত বড় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসের সাইবার স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোতে ৮০টির বেশি দেশের মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছেন। এসব কেন্দ্রে মানুষকে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নেওয়া হয় এবং পরে নথিপত্র কেড়ে নিয়ে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়।
কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসার পরও বিপদ শেষ হচ্ছে না। অনেকের বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ থেকে যায়, নিয়োগকারী বা দালালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয় এবং তাঁদের নামে বিদেশে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগও থাকতে পারে। সেপ্টেম্বরের দেশে ফেরা ৩৮ জনের অনেকে নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য তাই ঘটনাটি শুধু বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার ঘটনা নয়। একটি বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যদি একজন নাগরিক আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধচক্রের হাতে পৌঁছে যান, তাহলে সমস্যাটি শুধু দালালের নয়। নিয়োগ, ভিসা, ছাড়পত্র, বিদেশে গ্রহণকারী পক্ষ এবং দেশে ফেরার পর ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ সহ পুরো ব্যবস্থার।
চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন তদন্তের মূল জায়গা। কে বিজ্ঞাপন দেয়, কে টাকা নেয়, কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্মী পাঠায়, কীভাবে ভিসা হয়, বিমানবন্দরে কে গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত কোন চক্রের কাছে মানুষ পৌঁছে যায় এই প্রতিটি ধাপের যোগসূত্র বের করতে না পারলে উদ্ধার হওয়া মানুষগুলোর সংখ্যা হয়তো বাড়বে, কিন্তু মানুষ পাচারের পথটি বন্ধ হবে না।
নবোদয়/ আরআই/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬