Loading...

বিনিয়োগে গতি নেই
রিজার্ভ ৩৬.৩১ বিলিয়ন ডলার হলেও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ৫ শতাংশের নিচে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও দুর্বল।


বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গত এক বছরে যে উন্নতি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু সেই স্বস্তি এখনো দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। একদিকে ডলার আসছে, রিজার্ভ বাড়ছে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকছে অন্যদিকে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কম, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি দুর্বল, শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত এবং মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য। বাইরের হিসাবে স্থিতি ফিরলেও ভেতরের অর্থনীতি এখনো গতি খুঁজছে।
সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে তা ৩১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আগস্টের শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ হিসাবে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও গত বছরের তুলনায় রিজার্ভের অবস্থান অনেক শক্তিশালী।
এই উন্নতির মূল কারণ আমদানি হঠাৎ কমে যাওয়া নয়। বরং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ার বিষয়টিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ এবং আগস্টে প্রায় ২৯৭ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। আগস্টে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে আগস্টে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৪৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহের বড় ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তির বিপরীতে আমদানির ভেতরের চিত্রটি বেশ ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আমদানির ভেতরে শিল্পের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমেছে। শিল্পের কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তিও ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ মোট আমদানি কোনোভাবে স্থির থাকলেও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় আমদানিতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখা যায়নি।
এই জায়গাতেই রিজার্ভের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পার্থক্যটি সবচেয়ে পরিষ্কার হয়। একটি অর্থনীতি যখন বিনিয়োগের জন্য যন্ত্রপাতি আনে, শিল্পের কাঁচামাল কেনে, নতুন কারখানা স্থাপন করে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায়, তখন তার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও বাড়তে পারে। বিপরীতে আমদানি-চাহিদা দুর্বল থাকলে রিজার্ভের ওপর চাপ কম থাকে। তাই শুধু রিজার্ভের পরিমাণ দেখে অর্থনীতির শক্তি মাপা যায় না; দেখতে হয় সেই রিজার্ভের সঙ্গে উৎপাদন ও বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ছে কি না।
ব্যাংক খাতের তথ্যও একই সংকেত দিচ্ছে। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে যায় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হলেও টানা পঞ্চম মাস এটি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও ব্যাংকারদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্বল ব্যবসায়িক চাহিদা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা নতুন ঋণের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে দেশের উৎপাদন অর্থনীতিও খুব শক্তিশালী অবস্থায় নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের তুলনায় বেশি হলেও এখনো উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে ফিরতে পারেনি। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক দশমিক ২৮ শতাংশে নেমেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যালোচনাতেও দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ এবং শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতাকে অর্থনীতির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের আয় ও ব্যয়ের আরেকটি বৈপরীত্য। আগস্টে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি এখনো মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে বাড়ছে। এর মানে, পরিবারের আয় হিসেবে বাড়লেও বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার জায়গায় খুব বেশি স্বস্তি আসছে না।
কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষ শ্রমশক্তিতে রয়েছে এবং প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। নতুন শিল্প, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি যদি দুর্বল থাকে, তাহলে এই বিপুল নতুন শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা কঠিন হবে। তবে ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ নতুন শ্রমশক্তি জরিপ এখনো প্রকাশিত না হওয়ায় সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতির সরাসরি পরিমাপের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্রকে একটি বাক্যে বলা যায় বৈদেশিক হিসাবের ভারসাম্য ফিরছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগের ইঞ্জিন এখনো পুরো শক্তিতে চলছে না। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে, কিন্তু সেই ডলার এখনো যথেষ্ট পরিমাণে নতুন কারখানা, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে না। বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ঋণের ঝুঁকি এবং দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা সেই রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে আছে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬