Loading...

সেপ্টেম্বরে প্রাণ গেল ১৪৮ জনের
জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সেপ্টেম্বরের অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ দীর্ঘায়িত করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফলে পুরোনো ক্যালেন্ডার ধরে নির্দিষ্ট কয়েক মাস মশা নিয়ন্ত্রণের বদলে আবহাওয়া ও রোগের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বছরজুড়ে নজরদারি প্রয়োজন।


বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৌসুম আসার আগেই ঝুঁকির সংকেত মিলেছিল। বর্ষা শুরুর আগে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। শুধু ঝুঁকি শনাক্তই নয়, জুনের শেষ দিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ না হলে জুলাইয়ে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী জুনের তুলনায় দ্বিগুণ এবং আগস্টে তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তারপরও সেপ্টেম্বর এসে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ জায়গায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৪৩। সেপ্টেম্বরের শেষে এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ২৪৫ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগী ৭৯ হাজার ৬২০ জন। অক্টোবরেও সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থাৎ এবারের সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু ডেঙ্গু বেড়ে যাওয়া নয়; বরং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার আগেই যে তথ্য হাতে ছিল, সেই তথ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল সেটি এখন সামনে আসছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মে মাসের প্রাক্-বর্ষা জরিপটি ছিল সেই আগাম সতর্কবার্তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে জরিপ চালিয়ে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়। আক্রান্ত স্থাপনার মধ্যে ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল বহুতল ভবন, ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ একক বাড়ি এবং ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবন। সবচেয়ে বেশি প্রজননস্থল পাওয়া যায় মেঝেতে জমে থাকা পানিতে, এরপর বালতি ও প্লাস্টিকের ড্রামে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ২৭টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে ৭ জুন থেকে বিশেষ পাঁচ দিনের অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ আরও ৩৬টি ওয়ার্ডে একই ধরনের কার্যক্রম চালানোর কথা ছিল। অর্থাৎ কোথায় সমস্যা বেশি, সেটি আগে থেকেই শনাক্ত ছিল এবং ঝুঁকির ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সংক্রমণের যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে ওই আগাম ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু রাস্তায় বা খোলা জায়গায় ওষুধ ছিটানোর বিষয় নয়। এডিস মশার বড় অংশ জন্ম নেয় মানুষের বসতবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা ছোট ছোট পানির আধারে। ফলে উড়ন্ত মশা নিধনের পাশাপাশি নিয়মিত লার্ভা শনাক্ত ও প্রজননস্থল ধ্বংস করা না গেলে কেবল ফগিং দিয়ে সংক্রমণ ঠেকানো কঠিন।
সমস্যাটি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ১১ বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যয় প্রায় ৫৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণের প্রায় ২৭৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। চলতি বছরও মশা নিয়ন্ত্রণে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবু প্রতিবছর ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
আরও বড় অঙ্ক দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি বাজেটের হিসাবে। বাজেট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ফলাফল সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।

এখানে ব্যর্থতার অর্থ অবশ্যই অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়। বরং বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, মশা নিয়ন্ত্রণে যে অর্থ, জনবল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। কোনো ওয়ার্ডে অভিযান চালানোর পর সেখানে এডিসের ঘনত্ব কতটা কমল, কয়েক সপ্তাহ পর আবার জরিপ করে তা দেখা হলো কি না, কোন পদ্ধতি কাজ করছে আর কোনটি করছে না এই ফলাফলভিত্তিক নজরদারি ছাড়া প্রতিবছর একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ী পরিবর্তন আনা কঠিন।
জুনের শেষ দিকেই বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, বাংলাদেশে মশার প্রজননস্থল ও সংক্রমণের ক্লাস্টার যথাযথভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা এবং কার্যকর আগাম সতর্কতা কাঠামো এখনও দুর্বল। তখনই জুনে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে ৫ হাজার ৯২৪ এবং মৃত্যু ১৮-তে পৌঁছেছিল।
এরপর জুলাইয়ে রোগী বেড়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৮ দিনেই ২৩ হাজার ৩০১-এ পৌঁছায়। একই সময়ে মৃত্যুও দ্রুত বাড়ে। সেপ্টেম্বরে ১৮ দিনেই ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং মাস শেষে তা ১৪৮-এ পৌঁছে যায়।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, ডেঙ্গুর বিস্তার হঠাৎ করে সেপ্টেম্বরের কোনো এক সময়ে শুরু হয়নি। বরং মে মাসে মশার ঘনত্বের ঝুঁকি শনাক্ত, জুনে দ্রুত সংক্রমণের পূর্বাভাস, জুলাই-আগস্টে রোগীর ঊর্ধ্বগতি এবং সেপ্টেম্বরে ব্যাপক মৃত্যু পুরো প্রক্রিয়াটিই কয়েক মাস ধরে দৃশ্যমান ছিল।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে এখনো অনেকাংশে মৌসুমি অভিযান হিসেবে দেখা। অথচ এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার পর সেটি ধ্বংস করার চেয়ে নিয়মিত নজরদারি করে আগেই তা সরিয়ে ফেলা বেশি কার্যকর। বিশেষ করে বহুতল ভবন ও নির্মাণাধীন স্থাপনা থেকে যখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছে, তখন শুধু সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে অভিযান চালিয়ে পুরো ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সেপ্টেম্বরের অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ দীর্ঘায়িত করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ফলে পুরোনো ক্যালেন্ডার ধরে নির্দিষ্ট কয়েক মাস মশা নিয়ন্ত্রণের বদলে আবহাওয়া ও রোগের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বছরজুড়ে নজরদারি প্রয়োজন।
তবে সব দায় সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। এডিস মশার বড় অংশের প্রজননস্থল ব্যক্তিগত ও বেসরকারি স্থাপনায়। তাই বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা নিয়মিত পরিদর্শন এবং প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতথ্য, স্থানীয় সরকারের মশা জরিপ এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনতে না পারলে একটি সংস্থার তথ্য অন্য সংস্থার কাজে পুরোপুরি ব্যবহার হবে না।
২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি তাই শুধু আরেকটি মৌসুমি প্রাদুর্ভাবের গল্প নয়। এটি আগাম তথ্য পাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, অর্থ বরাদ্দ দেওয়া, অভিযান পরিচালনা এবং সেই অভিযানের ফলাফল মাপার পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতার পরীক্ষা। মে মাসে ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু পূর্বাভাস থাকা যথেষ্ট নয়; সেই পূর্বাভাসকে দ্রুত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ফলাফল মাপা যায় এমন ব্যবস্থায় পরিণত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নবোদয়/ আরআই/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬