Loading...

বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস
শিশু ধর্ষণ: বিচারহীনতার গোলকধাঁধায় পিষ্ট শৈশব, ৯৭ শতাংশ মামলাতেই মেলে না সাজা | আপনজনের লালসা ও আইনের ফাঁক: অভিযোগ থেকে আদালত—যেখানে থমকে যায় শিশুর ন্যায়বিচার |


রাজধানীর এক আইনজীবীর চেম্বারে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন এক মা। তার আকুতি—ছয় বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া সিএনজিচালক স্বামীকে যেন মামলা থেকে রেহাই দেওয়া হয়! কারণ, স্বামী জেলে থাকায় দুই সন্তান নিয়ে তিনি চরম অর্থকষ্টে পড়েছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার তাকে জানান, এমন গুরুতর অপরাধে আপস-মীমাংসার কোনো আইনি সুযোগ নেই। নিরুপায় মা তখন মাথা নিচু করে ফিরে যান।
আরেকটি ঘটনায় ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর, আদালতে সাক্ষ্য দিয়েও বাবা চাইছেন প্রভাবশালী আসামিপক্ষের সঙ্গে আপস করতে। তার অসহায় প্রশ্ন, "আপা, বিচার পেতে যে কয়েক বছর লাগবে, ততদিন কি আমি জ্যান্ত থাকতে পারব?"
এই দুটি খণ্ডচিত্রই বলে দেয়, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ। কঠোর আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অসহায়ত্ব, সামাজিক চাপ, প্রভাবশালীদের হুমকি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অভিযোগ থেকে আদালত পর্যন্ত পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিচার।
শত্রু যখন ঘরের ভেতরে
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর ২০২৫ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য উঠে এসেছে। ৩০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তদের ৪০.৫৮ শতাংশই নিকট প্রতিবেশী, ১৩.৬৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ১৪.৬১ শতাংশ শিক্ষক। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, ধর্ষণের ৫৯ শতাংশ এবং হত্যার ৬৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটে শিশুর আপন গৃহে।
বেসরকারি সংস্থা ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা জানান, অপরাধী যখন আপন কেউ হয়, তখন ‘পারিবারিক সম্মান’ বা আর্থিক নির্ভরতার কারণে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। কক্সবাজারের এক দিনমজুরের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ে তার আপন চাচার দ্বারা ধর্ষিত হয়ে সন্তানের জন্ম দিলেও, চাচার সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রতিশোধের ভয়ে পরিবারটি কোনো অভিযোগই দায়ের করেনি।
নষ্ট হচ্ছে প্রমাণ, থমকে যাচ্ছে তদন্ত
অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার ধর্ষণের শিকার শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই গোসল করিয়ে বা কাপড় ধুয়ে ফেলে। ফলে ডিএনএ ও গুরুত্বপূর্ণ বায়োলজিক্যাল প্রমাণ চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে শিশু ধর্ষণের ১,৭১৫টি মামলা হয়েছে। কিন্তু ফরেনসিক প্রমাণের অভাব এবং নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে তদন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলাও স্পষ্ট। নারী ও শিশুদের জরুরি সহায়তা দেওয়া ওসিসি, ক্রাইসিস সেল ও ডিএনএ ল্যাবের ৩৭৩ জন কর্মী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৯ মাস ধরে বেতনই পাচ্ছেন না। দেশে প্রতি ১ লাখ ৩ হাজার শিশুর সুরক্ষায় রয়েছেন মাত্র একজন সমাজকর্মী!
বিচারের নামে প্রহসন ও দীর্ঘসূত্রতা
আইন অনুযায়ী শিশু ধর্ষণের বিচার ৯০ দিনে শেষ করার কথা থাকলেও, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের ২০২৬ সালের যৌথ গবেষণায় দেশের ৩২ জেলার ৪,০৪০টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলা পর্যালোচনা করে এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।
দেখা গেছে, একেকটি মামলার তদন্ত শেষ হতে সময় লেগেছে গড়ে ১৫২ দিন (আইনে যা ১৫ দিন)। আর বিচার শেষ হতে গড়ে সময় লেগেছে ১ হাজার ৩৭০ দিন বা প্রায় পৌনে চার বছর! এই দীর্ঘ সময়ে গড়ে ২২ বার শুনানি হয়, যেখানে ৭ জন সাক্ষীর মধ্যে গড়ে মাত্র ২ জন আদালতে হাজির হন।
সবচেয়ে হতাশাজনক হলো শাস্তির হার। মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামির সাজা হয়েছে। ৭০.২ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছে এবং ১৩.৪ শতাংশ ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে জোরপূর্বক আপস হয়েছে। ১৫টি জেলায় কোনো আসামিরই সাজা হয়নি।
রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক ও গবেষক ফৌজুল আজিম বলেন, "বিচার চাইতে গিয়ে কোনো শিশু যেন পুনরায় মানসিক নিপীড়নের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিচারক কোনো প্রসিকিউটর নন; তদন্তকারী বা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হলে আদালত সাজা দিতে পারেন না।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধী যখন পরিবারের সদস্য হয় বা পরিবার যখন আপস করতে বাধ্য হয়, তখন শিশুর সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করে ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, উন্নত বিশ্বে শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আইনিভাবেই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকে।
বাংলাদেশেও শিশু আইন-২০১৩ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, শিশু কল্যাণ বোর্ডের সক্রিয়তা এবং একটি সমন্বিত আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার আপস করলেও, একটি শিশুর প্রতি হওয়া চরম অন্যায়ের দায়ভার থেকে রাষ্ট্র কোনোভাবেই নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ১১ অক্টোবর ২০২৬