Loading...

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় মার্কিন তৎপরতা
দিল্লিতে ১১ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের একত্র হওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ আঞ্চলিক নীতি সমন্বয়। কিন্তু বৈঠকের সময়টি বাড়তি তাৎপর্য বহন করে। মধ্য এশিয়ায় খনিজসম্পদ ও বিনিয়োগ নিয়ে মার্কিন তৎপরতা বাড়ছে, সামনে রয়েছে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলসহ মার্কো রুবিওর সফর।


দিল্লিতে ১১ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের একত্র হওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ আঞ্চলিক নীতি সমন্বয়। কিন্তু বৈঠকের সময়টি বাড়তি তাৎপর্য বহন করে। মধ্য এশিয়ায় খনিজসম্পদ ও বিনিয়োগ নিয়ে মার্কিন তৎপরতা বাড়ছে, সামনে রয়েছে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলসহ মার্কো রুবিওর সফর। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতেও যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ও সরবরাহব্যবস্থার বিষয়। এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক স্বার্থ জোরদারের ইঙ্গিত দেয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ভারতের রাজধানীতে সম্মেলনটির আয়োজন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশের মার্কিন দূতেরা অংশ নেন। ঢাকার রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসনও সেখানে যান। রুবিওর বক্তব্য ও গরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর আওতায়। গরও শুধু ভারতে রাষ্ট্রদূত নন; তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত। তার এই দ্বৈত দায়িত্ব দিল্লিতে আঞ্চলিক সম্মেলন আয়োজনের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কূটনৈতিক নেতৃত্বের বৈঠক; অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার নিয়ে গঠিত কোনো আঞ্চলিক জোটের সম্মেলন নয়।
সময় নির্বাচনের তাৎপর্য রয়েছে। গরের ঘোষণা অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি উজবেকিস্তানের সমরকন্দে যাওয়ার কথা রুবিওর। সঙ্গে থাকবে শতাধিক মার্কিন কোম্পানির প্রতিনিধিদল। সেখানে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ‘সি৫+১’ বৈঠকেও তার অংশ নেওয়ার কথা। এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশকে এক আলোচনামঞ্চে আনে।
বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের পরিকল্পনা দেখায়, ওয়াশিংটনের আগ্রহ কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাজার ও বিনিয়োগেও। সফরের আগে দূতদের কাছ থেকে স্থানীয় পরিস্থিতি জানা এবং অগ্রাধিকার সমন্বয় করা কাজে আসতে পারে। এটি ঘটনাক্রম থেকে পাওয়া সম্ভাব্য ব্যাখ্যা; দিল্লির সম্মেলনকে ওই সফরের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিবৈঠক হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

খনিজসম্পদ নিয়ে আগ্রহের প্রমাণও আগের ঘটনাগুলোতে আছে। ১০ জুন কাজাখস্তানের আস্তানায় গরের সহসভাপতিত্বে মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদবিষয়ক সংলাপ হয়। আয়োজকদের বিবরণ অনুযায়ী, আলোচনায় ছিল খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিশ্ববাজারে সরবরাহ। অর্থাৎ বর্তমান তৎপরতা কয়েক মাস ধরে চলা একটি ধারার সঙ্গে মেলে।
এর পেছনে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। উজবেকিস্তানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইএআইএসে ২২ জুন প্রকাশিত নাসিবা এরগাশোভার নীতিপত্রে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য এশিয়ানীতিতে সম্পদকেন্দ্রিক কূটনীতি ও সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার গুরুত্ব বেড়েছে। খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের প্রাধান্য রয়েছে; আবার মধ্য এশিয়ায় অবকাঠামো ও বিনিয়োগের বাধাও আছে। নীতিপত্রটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্থায়ী উপস্থিতি গড়তে ওয়াশিংটনকে আলোচনা থেকে বাস্তব প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগোতে হবে।
এএনআই বৈঠকটির উদ্দেশ্য হিসেবে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার অগ্রাধিকার সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি গরের সাম্প্রতিক রাজস্থান সফরে ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক মহড়া প্রত্যক্ষ করার তথ্যও দিয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক তৎপরতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বও দৃশ্যমান হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট যোগসূত্রটি বাণিজ্যে। ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত মার্কিন-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির সরকারি বিবরণে সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের কথা আছে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নিরাপত্তার বিবেচনাও যুক্ত হচ্ছে।
চুক্তির মূল পাঠে ১৫ বছরে আনুমানিক দেড় হাজার কোটি ডলারের মার্কিন জ্বালানি কেনা বা কেনায় সহায়তার চেষ্টা করার কথা রয়েছে; এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। এটি ইতিমধ্যে সম্পন্ন কেনাকাটার হিসাব নয়। এই শর্তগুলো দেখায়, বাংলাদেশের বাজার ও জ্বালানি চাহিদা ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও দরকষাকষির প্রশ্ন একসঙ্গে আসতে পারে। নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্বালানির উৎস অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। ঢাকার জন্য বিচার্য হবে সম্ভাব্য সুবিধার সঙ্গে শর্ত ও ব্যয়ের সম্পর্ক।
প্রকাশ্য ঘোষণায় বিস্তারিত আলোচ্যসূচি বা নতুন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বাংলাদেশসংক্রান্ত বিশেষ কোনো সিদ্ধান্তেরও তথ্য জানা যায়নি। তাই বলা যায় বৈঠকটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় চলমান মার্কিন তৎপরতার মধ্যে দূতদের সমন্বয়। এর প্রকৃত গুরুত্ব স্পষ্ট হবে পরবর্তী বাণিজ্যচুক্তি, বিনিয়োগ, খনিজ প্রকল্প ও নিরাপত্তা উদ্যোগে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০১ অক্টোবর ২০২৬