Loading...

ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরোলেই ঝুঁকি
সন্ধ্যার পর সহপাঠীর সঙ্গে বের হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা শিক্ষা সফর—কোনো পরিস্থিতিই যেন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ থাকছে না। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) এক ছাত্রীকে আটকে যৌন হয়রানি এবং তার সহপাঠীকে মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ সেই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।


সন্ধ্যার পর সহপাঠীর সঙ্গে বের হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা শিক্ষা সফর—কোনো পরিস্থিতিই যেন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ থাকছে না। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) এক ছাত্রীকে আটকে যৌন হয়রানি এবং তার সহপাঠীকে মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ সেই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
এর আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া নারীদের ঘিরে যৌন হয়রানি, নিপীড়ন, হুমকি ও হামলার একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি টার্গেটের শিকার হচ্ছে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাই।
২২ সেপ্টেম্বর দুমকির জামেয়া দাখিল মাদ্রাসা সড়কে পবিপ্রবির ছাত্রী সাদিয়া ইসলাম শিখা ও তার সহপাঠী আব্দুল কাইয়ুমকে কয়েকজন যুবক পথরোধ করে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, কাইয়ুমকে মারধরের পর টাকা ও মোবাইল ফোন নেওয়া হয়। পরে সাদিয়াকে আলাদা জায়গায় নিয়ে যৌন হয়রানি করা হয়। পরদিন তিনি মামলা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা পলাতক এবং গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো চিত্র নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী শাটল ট্রেনে ওঠার সময় যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। মামলার পর অভিযুক্ত এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আগস্টে বাগেরহাটের ফকিরহাটে সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীকে কটূক্তি, যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের হুমকির অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদ করায় এক সহপাঠীকেও মারধরের অভিযোগ ছিল। মামলার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সেপ্টেম্বরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি এবং পোশাক খুলে দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী কান্নারত অবস্থায় রাস্তায় বেরিয়ে এলে স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। পরে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি মামলা করেন।
একই মাসে কক্সবাজারের টেকনাফে এক কলেজছাত্রীকে চলন্ত ইজিবাইক থেকে নামিয়ে মারধর, আটকে রেখে নির্যাতন ও তার সঙ্গে থাকা টাকা-স্বর্ণ নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও ঝুঁকির চিত্র আছে। মে মাসে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে শিক্ষা সফরে যৌন হয়রানির অভিযোগে এক শিক্ষককে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগটি তদন্তে কমিটিও গঠন করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মে মাসে এক নারী শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের ভেতরে রাস্তা থেকে ঝোপের দিকে টেনে নিয়ে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন।
এসব ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ওপর প্রভাব শুধু মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কোথাও নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, কোথাও সামাজিক চাপ, আবার কোথাও পরিচয় প্রকাশ ও ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিবারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর ঘটনায় অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে মামলা করার তথ্যটি দেখায়, অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্তেও পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬-এর পত্রিকাভিত্তিক তথ্যেও যৌন হয়রানিকে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে শুধু আগস্টেই ২৫২ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে; তাঁদের মধ্যে ৫৪ জন ধর্ষণের শিকার এবং ৫৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান পুরো ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা নয়, কারণ এগুলো প্রকাশিত সংবাদভিত্তিক।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও রয়েছে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের পর একজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং আরও আটজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইউজিসি আগস্টে জানিয়েছে, শুধু যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করলেই হবে না; অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। একই উদ্যোগে ইউজিসি ও ইউএন উইমেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকারের কার্যকর কাঠামো। ১৬ সেপ্টেম্বরের এক গোলটেবিলে বিশেষজ্ঞরা এমন একটি সমন্বিত আইন ও ব্যবস্থা চেয়েছেন, যেখানে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেছেন, হয়রানির শিকার নারীর পোশাক বা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি এখনো রয়েছে এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফলে পরিত্রাণের পথ শুধু ঘটনার পর গ্রেপ্তার বা মামলা পর্যন্ত সীমিত নয়। বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক উদ্যোগের আলোচনায় উঠে এসেছে—নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, গোপনীয়তা রক্ষা, কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, বহিরাগতদের নজরদারি এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান জবাবদিহি—এই কয়েকটি স্তর একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
নবোদয়/ কেএ/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬