Loading...

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
মালয়েশিয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো শুরু করতেই বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর একটি তুলনা সামনে এসেছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছে। তালিকা বিনিময় হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে, চীনকে মধ্যস্থতায় আনা হয়েছে, পরীক্ষামূলক প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনাও হয়েছে।


মালয়েশিয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো শুরু করতেই বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর একটি তুলনা সামনে এসেছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছে।
তালিকা বিনিময় হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে, চীনকে মধ্যস্থতায় আনা হয়েছে, পরীক্ষামূলক প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনাও হয়েছে। তবু সংগঠিতভাবে একজন রোহিঙ্গারও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। বাংলাদেশ সরকার জুনেও জাতিসংঘে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা, তা প্রকাশ করেনি মালয়েশিয়া। ইউএনএইচসিআরও বলেছে, তারা এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয় এবং মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের উপযোগী নয়।
এখানেই মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির প্রথম বড় পার্থক্য। মালয়েশিয়ার বর্তমান দলটি মূলত অভিবাসন আটককেন্দ্রে থাকা যাচাই করা মিয়ানমার নাগরিকদের নিয়ে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, অভিবাসন আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়ায় আটক থাকা নাগরিকদের ফেরাতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় হয়েছে। ২০২১ সালেও একইভাবে ১ হাজার ৮৬ জনকে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত নেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংকটটি ভিন্ন। এখানে থাকা অধিকাংশ শরণার্থী রোহিঙ্গা, যাদের মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তারা মূলত রাখাইনে সেনাবাহিনীর ২০১৭ সালের দমন-পীড়নের পর পালিয়ে এসেছেন। ফলে তাদের ফেরানো মানে শুধু সীমান্ত পার করে দেওয়া নয়; নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, জমি ও নিজ এলাকায় ফেরার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও জড়িত।
এই কারণেই ২০১৮ সালের প্রথম বড় প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরানোর প্রস্তুতি থাকলেও ইউএনএইচসিআরের সাক্ষাৎকারে কেউ ফিরতে রাজি হননি। ২০১৯ সালে মিয়ানমার ৩ হাজার ৪৫০ জনকে ফেরত নেওয়ার অনুমোদন দিলেও একই ফল হয়। রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন।
২০২৬ সালেও সেই মৌলিক বাধা কাটেনি। আগস্টে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশের পাঠানো প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার নামের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করা হয়েছে। তারপরও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরত নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে নেপিদো।
বরং রাখাইনের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকায় এখন সামরিক সরকারের বদলে আরাকান আর্মির প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও জুনে সংসদে বলেছেন, প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি নির্ভর করছে রাখাইনের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর; সরকার মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির মধ্যে কার্যকর সংলাপ তৈরির চেষ্টা করছে।

নিরাপত্তার বাস্তবতাও সুখকর নয়। সোমবার রাখাইনের কিয়াউকতাও এলাকায় সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৪৯ থেকে ৫০ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ এসেছে।
তাহলে বাংলাদেশের কূটনীতি কি ব্যর্থ? বিষয়টি এত সরল নয়, কিন্তু দীর্ঘ অচলাবস্থা কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ২০১৯ সালেই একে সরাসরি কূটনৈতিক ‘ব্যর্থতা’ না বলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
মালয়েশিয়ার ঘটনাটি তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত, কিন্তু সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুত মডেল নয়। মালয়েশিয়া আটক থাকা কিছু যাচাইকৃত মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে; এমনকি ওই প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসম্মতি নিয়েও জাতিসংঘ ও ১৬০টির বেশি মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের সামনে কঠিন কাজটি অন্য জায়গায়—প্রায় ১২ লাখ মানুষের এমন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা, যাতে সীমান্ত পার হওয়ার পর তারা আবার বাস্তুচ্যুত বা নির্যাতনের শিকার না হন। নয় বছর ধরে সেই পরিবেশ তৈরি করা যায়নি।
আর এত বছরেও যদি কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তৈরি করতে না পারে, তাহলে একই বৈঠক ও একই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তির বদলে কৌশল বদলানোর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬