Loading...

কন্যাশিশুর সুরক্ষায় জবাবদিহির প্রশ্ন
এই সংখ্যা সামনে আনছে অপরাধের আগে ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং পরে শিশুকে নিরাপদ জীবনে ফেরানোর ব্যবস্থার প্রশ্ন। কতজন চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে, কত ঘটনার তদন্ত ও বিচার এগিয়েছে—এসব ফলাফল ছাড়া সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা বোঝা কঠিন।


২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৪ কন্যাশিশুকে ঘিরে নির্যাতন ও সহিংসতার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা সামনে আনছে অপরাধের আগে ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং পরে শিশুকে নিরাপদ জীবনে ফেরানোর ব্যবস্থার প্রশ্ন। কতজন চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে, কত ঘটনার তদন্ত ও বিচার এগিয়েছে—এসব ফলাফল ছাড়া সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা বোঝা কঠিন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের আট মাসের হিসাবে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার মোট সংখ্যা ১ হাজার ৯১৯। এর মধ্যে কন্যাশিশু ৮৮৪ এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারী ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ নথিভুক্ত হিসাবে কন্যাশিশুর অংশ প্রায় ৪৬ শতাংশ। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি এই তথ্য সংগ্রহ করেছে।
যৌন সহিংসতার পরিসংখ্যানে শিশুদের ঝুঁকি দৃশ্যমান। ধর্ষণের শিকার হিসেবে নথিভুক্ত ৩৩১ জনের মধ্যে ২৪০ জন কন্যাশিশু, প্রায় ৭৩ শতাংশ। শিশুদের মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৫৫ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ২২ জন। আরও ১১২ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো প্রতিরোধের পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন তুলে ধরে।
মাসভিত্তিক হিসাবে প্রথম চার মাসে কন্যাশিশুর সংখ্যা ছিল ৩০৬; পরের চার মাসে ৫৭৮। জুনে সর্বোচ্চ ১৭৭ জনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে সংবাদভিত্তিক এই হিসাব দেশের সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ জরিপ নয়। সংবাদে না আসা নির্যাতন এতে ধরা পড়ে না। সংবাদপ্রকাশ ও তথ্যসংগ্রহের পরিবর্তন বিবেচনা ছাড়া সংখ্যার ওঠানামাকে প্রকৃত সহিংসতা বৃদ্ধির নিশ্চিত হার বলাও যায় না।
সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে ইউনিসেফও উদ্বেগ জানিয়েছে। গত ২২ মে এক বিবৃতিতে সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স প্রতিরোধ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরাপত্তা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচার এবং সামাজিক সেবার দুর্বলতা দূর করার আহ্বান জানান। বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কর্মস্থল ও পরিচর্যার পরিবেশে জবাবদিহি বাড়ানো এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের মানসিক সহায়তার প্রয়োজনও তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্য, পুলিশ, বিচার ও সামাজিক সেবার মধ্যে ব্যবধান দূর করার সুপারিশ রয়েছে ইউএনএফপিএ, ইউএন উইমেন ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনেও। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তির প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তি। অর্থাৎ অভিযোগের পর চিকিৎসা, নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের মধ্যে সংযোগ থাকা জরুরি। একটি সেবার ঘাটতি অন্যটির কার্যকারিতাকেও দুর্বল করতে পারে।

এই জায়গায় জবাবদিহির মানদণ্ড স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কত ঘটনায় অভিযোগ গ্রহণ হয়েছে, কতটির তদন্ত শেষ, কত শিশুর নিরাপদ আশ্রয় মিলেছে এবং কতজন পড়াশোনায় ফিরেছে—এসব সূচক নিয়মিত প্রকাশ করলে সুরক্ষাব্যবস্থার ফল বোঝা যাবে। প্রকাশযোগ্য সামষ্টিক তথ্যের সঙ্গে শিশুর ব্যক্তিগত পরিচয় সুরক্ষিত রাখাও জরুরি। মামলা হয়েছে কি না, সেটিই একটি শিশুর নিরাপদ জীবনে ফেরার সম্পূর্ণ হিসাব নয়।
পরিসংখ্যানে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ১৭টি ঘটনাও রয়েছে। এটি দেখায়, আগেভাগে হস্তক্ষেপের সুযোগ আছে। সেই সুযোগকে নিয়মিত ব্যবস্থায় আনতে বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবার যোগাযোগ কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। শিশুর অনুপস্থিতি, কাজের জন্য ঝরে পড়া বা বিয়ের প্রস্তুতির মতো ঝুঁকির খবর সংশ্লিষ্ট সেবায় পৌঁছানো এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রতিরোধের অংশ হতে পারে। গবেষক ও সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের বক্তব্যেও কন্যাশিশুর প্রতি জন্ম থেকে বৈষম্য এবং অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতার বিষয়টি এসেছে। পরিবারের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর কাজও সামাজিক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত।
শিশুর সুরক্ষায় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও রয়েছে। ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশ আবারও তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং মানসিক আঘাত বাড়ায়। তাই অপরাধের খবর প্রকাশের সময় পরিচয় গোপন রাখা সুরক্ষার অংশ। জনসমক্ষে আলোচনার চাপ শিশুর ওপর পড়ে গেলে সহায়তা চাওয়ার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৮৮৪ কন্যাশিশুর হিসাবের পরের প্রশ্ন তাই অপরাধের প্রতিক্রিয়া কতটা কার্যকর। প্রতিরোধে বাজেট, তদন্তে সক্ষমতা, চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার এবং পুনর্বাসনে ধারাবাহিক সহায়তার ফল দৃশ্যমান করতে হবে। ঘটনার তালিকা প্রয়োজন; সেই তালিকার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অগ্রগতিও প্রকাশ করা প্রয়োজন। সুরক্ষার দায়িত্ব তখনই পরিমাপযোগ্য হবে, যখন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি শিশুর জীবনে ফেরার বাস্তব ফল সামনে আসবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬