Loading...

নতুন মাত্রা যোগ করেছে এ আই
একসময় এমন কাজ মূলত বড় রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বাণিজ্যিক উপগ্রহ, ভূস্থানিক তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সেই সক্ষমতা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে এই পরিবর্তন এখন সরাসরি সামরিক প্রভাব ফেলছে।


একটি স্যাটেলাইট পৃথিবীর কয়েক শ কিলোমিটার ওপর দিয়ে ঘুরছে। নিচে একটি সামরিক ঘাঁটি, একটি বিমান, কিংবা সমুদ্রে চলা একটি জাহাজ। স্যাটেলাইট সেখানে ছবি তুলছে। সেই ছবি পৃথিবীতে নামার পর কেউ মানচিত্রে জায়গাগুলো চিহ্নিত করছে, পুরোনো ছবির সঙ্গে মিলিয়ে পরিবর্তন খুঁজছে, কোথায় নতুন স্থাপনা হয়েছে বা কোন জাহাজ কোন পথে চলছে তার হিসাব করছে।
একসময় এমন কাজ মূলত বড় রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বাণিজ্যিক উপগ্রহ, ভূস্থানিক তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সেই সক্ষমতা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে এই পরিবর্তন এখন সরাসরি সামরিক প্রভাব ফেলছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইরান ১৭ জুলাই জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে চীনা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে উচ্চ-রেজল্যুশনের উপগ্রহচিত্র পেয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন। ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত ও আরও কয়েকজন আহত হন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার আগে এবং পরে ওই ঘাঁটির ছবি পাওয়া গিয়েছিল।

তাঁদের মতে, এসব চিত্র ইরানের লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তবে এই তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে বেনামি মার্কিন সূত্রের মাধ্যমে এবং রয়টার্স জানিয়েছিল, তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। চীনও অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, কোনো প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগের বিরোধিতা করে তারা।
২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনা গোষ্ঠীর সরবরাহ করা স্যাটেলাইটচিত্র ও ভূস্থানিক তথ্য ইরানের জাহাজ শনাক্ত করার সক্ষমতাও বাড়িয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আরও নির্ভুল হামলার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব তথ্য গত কয়েক মাসে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উপগ্রহচিত্রের ব্যবহার বদলে গেছে। আগে যুদ্ধক্ষেত্রে ছবি মানে ছিল প্রধানত নজরদারি। কোথায় কী আছে, কোথায় সেনা সরানো হয়েছে, কোথায় অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন একই এলাকার ধারাবাহিক ছবি পাশাপাশি বসিয়ে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন বোঝা যায়।
নতুন রানওয়ে, ঘাঁটির সম্প্রসারণ, গাড়ির অবস্থান, জাহাজের উপস্থিতি কিংবা কোনো স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি এসব চিহ্নিত করা সম্ভব। এর সঙ্গে ভূস্থানিক তথ্য যোগ হলে ছবির অর্থও বাড়ে। ফলে স্যাটেলাইট কেবল ছবি দেয় না; একটি নির্দিষ্ট স্থানের সময়ভিত্তিক তথ্যের স্তর তৈরি করে।

আরও বড় পরিবর্তন এসেছে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের বিস্তারে। পৃথিবীর কক্ষপথে এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক উপগ্রহ কাজ করছে। তারা এমন ছবি ও ভূস্থানিক তথ্য সংগ্রহ করছে, যা আগে শুধুই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থার আওতায় ছিল। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য আর পুরোপুরি রাষ্ট্রের গোপন সম্পদ থাকছে না। সংবাদমাধ্যম, গবেষক, বেসরকারি বিশ্লেষক এমনকি বিভিন্ন পক্ষও স্যাটেলাইটচিত্র ব্যবহার করে যুদ্ধের গতিপথ বিশ্লেষণ করতে পারছে।
এই পরিবর্তনের একটি দিক দেখা গেছে ইরান যুদ্ধেও। হামলার পর প্রকাশিত স্যাটেলাইটচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা, রানওয়ে, বিমান আশ্রয়কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই প্রযুক্তি একদিকে যুদ্ধ পরিচালনায় গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে, অন্যদিকে যুদ্ধের পর কী ঘটেছে তার স্বাধীন দৃশ্যমান প্রমাণও তৈরি করতে পারে।
এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন আরেকটি স্তর যোগ করছে। হাজার হাজার স্যাটেলাইটচিত্র হাতে নিয়ে মানুষ একে একে পরিবর্তন খুঁজে বের করা কঠিন। কিন্তু কম্পিউটার-ভিত্তিক ছবি বিশ্লেষণ একই এলাকার বহু সময়ের ছবি তুলনা করে পরিবর্তিত বস্তু শনাক্ত করতে পারে।

তাই আধুনিক যুদ্ধে আকাশের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়। কার কাছে কত স্যাটেলাইট আছে, কে কত দ্রুত ছবি তুলতে পারে, কার কাছে ভূস্থানিক তথ্য আছে, কে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে এবং কে সেটিকে সামরিক সিদ্ধান্তে রূপ দিতে পারে এসবও শক্তির অংশ।
এই পরিবর্তনের আরও বড় দিক আছে। ২ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এমন প্রযুক্তি নিয়ে এগোচ্ছে যার মাধ্যমে এক উপগ্রহ অন্য উপগ্রহকে অনুসরণ, পর্যবেক্ষণ, বাধাগ্রস্ত বা অক্ষম করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর মধ্যে কক্ষপথে চালনাযোগ্য উপগ্রহ, মহাকাশযান ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রতিযোগিতা শুধু পৃথিবীর ওপর নয়; পৃথিবীকে ঘিরে থাকা কক্ষপথও ক্রমে কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
এখন পর্যন্ত চীনা পক্ষের বিরুদ্ধে ইরানকে স্যাটেলাইটচিত্র সরবরাহের অভিযোগের সবচেয়ে স্পষ্ট অংশটি এসেছে মার্কিন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও সংবাদ প্রতিবেদনে; চীন সরাসরি তা অস্বীকার করেছে। তাই এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার অভিযোগ ও মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থাপন করাই সঠিক।
তবে অভিযোগটি সত্য হোক বা ভবিষ্যৎ তদন্তে এর পরিধি বদলে যাক, একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যে স্পষ্ট: মহাকাশের ছবি আর শুধু পৃথিবীকে দেখার প্রযুক্তি নয়। যুদ্ধের আগে সেই ছবি তথ্য, যুদ্ধের সময় তা সিদ্ধান্তের উপকরণ, আর যুদ্ধের পরে একই ছবি হয়ে উঠতে পারে প্রমাণ।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬