Loading...

নিয়োগ থেকে নাগরিক সেবা—ঘুসের চক্র
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানায় এক দিনের ব্যবধানে দুই এএসআইকে প্রত্যাহার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অতনু বণিককে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে একজনকে মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে।


হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানায় এক দিনের ব্যবধানে দুই এএসআইকে প্রত্যাহার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অতনু বণিককে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে একজনকে মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। আগের দিন প্রত্যাহার হন এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন।
দুজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অতনুর বিষয়ে গঠিত কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ওসি সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, অতনুর ভিডিওটি গত মার্চের; তদন্ত শেষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইলিয়াসের ভিডিওতে উচ্চারিত কথাটি নিয়োগ ব্যবস্থার দিকেও আঙুল তুলেছে। ‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুসের টাকা দিয়ে, ঘুস খাওয়ার জন্যই।’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’ তবে অভিযোগ সত্য হলে অনুসন্ধান শুধু কর্মীর ঘুস নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
নিয়োগ ঘিরেও অডিও ফাঁস হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ফেনী সিভিল সার্জন কার্যালয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ১০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগে এক শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। অডিওতে পরীক্ষার আগে চার লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, নিয়োগ স্বচ্ছ হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগেও অনিয়মের নজির রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে ঘুস লেনদেনের অডিও ফাঁসের ঘটনায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত এবং আরেকজনকে পদাবনতির সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট। শুধু সরকারি চাকরির নিয়োগে নয়, নজরদারি বিশ্ববিদ্যালয়েও জরুরি।

আবার কখনো কখনো রক্ষকই ভক্ষক হয়ে উঠে। ঘুস ঠেকানোর প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ দুদকের কর্মকর্তাও শাস্তি পেয়েছেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুদকের উপসহকারী পরিচালক সুদীপ কুমার চৌধুরীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। মামলা থেকে অব্যাহতির আশ্বাসে ঘুস দাবি ও গ্রহণের অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার কথা জানায় কমিশন। তদন্তে কথোপকথনের অডিও ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হয়েছিল।
বিক্ষিপ্ত ঘটনার বাইরে সমস্যার ব্যাপ্তি দেখায় টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩। জরিপে সেবা নেওয়া খানার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ ঘুস বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেওয়ার শিকার হয়েছে। ঘুসদাতা খানার ৭৭ দশমিক ২ শতাংশের বক্তব্য, ঘুস না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। জরিপের অভিজ্ঞতার সময়কাল ছিল ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল। অর্থাৎ প্রচলিত কথাটির পেছনে মানুষের সেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
নিয়োগে অর্থ লেনদেন প্রমাণিত হলে চাকরিকে বিনিয়োগ এবং ঘুসকে সেই বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার উপায় হিসেবে দেখার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু চাকরি পেতে টাকা দেওয়া পরবর্তী ঘুস গ্রহণের কোনো বৈধতা দেয় না। তদন্তে নিয়োগদাতা, মধ্যস্থতাকারী, টাকা গ্রহণকারী ও সুবিধাভোগীর ভূমিকা শনাক্ত করতে হবে।
নিয়োগের দুর্নীতি আড়ালে রেখে শুধু কর্মীকে সরালে দুর্নীতির উৎস অক্ষত থাকার আশঙ্কা থাকে। তবে সেবা পেতে বাধ্য হয়ে টাকা দেওয়া মানুষকে সুবিধা কেনার চক্রের সঙ্গে এক করে দেখলে ভুক্তভোগীরাই অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হবেন।
প্রতিরোধের প্রথম ধাপ তাই নিয়োগের স্বচ্ছতা। যোগ্যতা, পরীক্ষার নম্বর, মূল্যায়নের মানদণ্ড ও নির্বাচনের কারণ যাচাইযোগ্য করতে হবে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, নিয়োগ কমিটির স্বার্থের সংঘাত পরীক্ষা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার প্রয়োজন। ওইসিডির পাবলিক ইন্টেগ্রিটি হ্যান্ডবুকও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও তদারকির গুরুত্ব তুলে ধরে। একই মানদণ্ড পদোন্নতি ও পদায়নেও কার্যকর করা দরকার।

কর্মস্থলে ঘুসের সুযোগ কমাতে প্রতিটি সেবার নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা প্রকাশ, রসিদ বাধ্যতামূলক করা এবং আবেদন কোথায় আটকে আছে তা দেখার ব্যবস্থা প্রয়োজন। জরিপ প্রকাশের সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আংশিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় ঘুসের সুযোগ বহাল থাকে।
অনলাইন আবেদনের পরও টেবিলে টাকা দিতে হলে প্রযুক্তির সুফল মেলে না। টিআইবি সেবা পুরোপুরি ডিজিটাইজ করা, এক জায়গায় সেবা এবং গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে। কর্মীদের আচরণবিধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকিও জরুরি। নির্ধারিত সময় পেরোলে কোন কর্মকর্তার কাছে ফাইল আটকে ছিল, তার ব্যাখ্যা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষারও। পরিবারে অবৈধ উপার্জনকে সাফল্য হিসেবে সম্মান দিলে সততার শিক্ষা দুর্বল হয়। আয় ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান এবং সন্তানকে ঘুসের সুবিধা নিতে উৎসাহ না দেওয়া সামাজিক প্রতিরোধের অংশ। শিক্ষাঙ্গনে মুখস্থ নীতিকথার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার আলোচনা, নকল ও পক্ষপাতের বিরুদ্ধে সমান নিয়ম, স্বচ্ছ ভর্তি ও শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন।
সততার শিক্ষা কার্যকর হবে, যখন শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান নিজেরাও কাজে একই নীতি মেনে চলবেন। কর্মস্থলে সৎ কর্মীকে মূল্যায়ন এবং অনিয়ম জানানো কর্মীকে প্রতিশোধ থেকে রক্ষার ব্যবস্থাও সততার চর্চাকে শক্তিশালী করতে পারে।
ভিডিও আলোচনায় আনতে পারে একটি ঘটনা। প্রতিরোধে এমন ব্যবস্থা দরকার, যেখানে ভিডিও ভাইরাল ছাড়াই অভিযোগের তদন্ত হয়, সেবা পেতে বাড়তি টাকা লাগে না এবং ক্ষমতাবান নিয়োগদাতার কাছেও জবাব চাওয়া যায়।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬