Loading...

অণুজীব থেকে বিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পরিচিত একটি ফসলের একেবারে অদৃশ্য জগতেও এমন কিছু রাসায়নিক সম্পদ থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজে লাগতে পারে। পাট থেকে আমরা এত দিন আঁশ পেয়েছি; এখন হয়তো তার ভেতরের অণুজীব থেকেও বিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা খোঁজার সময় এসেছে।


পাটকে আমরা চিনি আঁশের ফসল হিসেবে। কৃষকের জমিতে পাট হয়, সেই পাট থেকে আঁশ বের হয়, আর আঁশ দিয়ে তৈরি হয় সুতা, বস্তা ও নানা ধরনের পণ্য। কিন্তু পাটগাছের ভেতরে এমন কিছু অণুজীবও বাস করে, যাদের তৈরি রাসায়নিক পদার্থ মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের নতুন গবেষণায় পাটগাছের ভেতরে থাকা একটি ছত্রাক থেকে ফুমাজিলিন নামের একটি পরিচিত রাসায়নিক যৌগ আলাদা করা হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি এমআরএসএসহ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুমাজিলিন নিজে নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নয়। এই যৌগটি আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের পরিচিত। নতুন গবেষণার গুরুত্ব হলো, বাংলাদেশের পাটগাছের ভেতরে থাকা একটি ছত্রাক থেকে এই যৌগ পাওয়া গেছে এবং পরীক্ষাগারে এর জীবাণুরোধী কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।
গবেষণাটি ২০২৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পাটগাছের ভেতরে থাকা Aspergillus fumigatus নামের একটি ছত্রাক নিয়ে কাজ করেছেন। গাছের ভেতরে বসবাস করলেও এই ধরনের অণুজীব সাধারণত গাছের দৃশ্যমান কোনো রোগ সৃষ্টি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গাছের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের কারণে এসব অণুজীব নিজেদের টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে পারে। সেই পদার্থগুলোর কিছু মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
গবেষকেরা প্রথমে ছত্রাকটি থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বের করেন। এরপর ধাপে ধাপে সেগুলো আলাদা ও বিশুদ্ধ করা হয়। উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি যৌগের পরিচয় শনাক্ত করা হয়—সেটিই ফুমাজিলিন। পরে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
এখানে এমআরএসএ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমআরএসএ হলো এমন এক ধরনের স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ব্যাকটেরিয়া, যা প্রচলিত কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। ফলে এই ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে নতুন কার্যকর রাসায়নিক পদার্থ খুঁজে বের করা এখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ফুমাজিলিনকে এমআরএসএসহ কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাগারে এটি ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষকেরা আরও দেখেছেন, বিভিন্ন তাপমাত্রা ও অম্লত্বের পরিবেশেও যৌগটির জীবাণুরোধী কার্যকারিতা কতটা বজায় থাকে। এসব পরীক্ষার ফল গবেষকদের কাছে নতুন অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে।
ব্যাকটেরিয়ার ওপর এটি কীভাবে কাজ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার ফল অনুযায়ী, ফুমাজিলিন ব্যাকটেরিয়ার প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে ও টিকে থাকতে পারে না। পরীক্ষায় আক্রান্ত ব্যাকটেরিয়ার কোষের গঠনেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার বিষয় আছে। পরীক্ষাগারে কোনো যৌগ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারলেই সেটি মানুষের জন্য ওষুধ হয়ে যায় না। এই গবেষণায় মানুষের শরীরে ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোনো যৌগকে চিকিৎসায় ব্যবহার করতে হলে প্রথমে প্রাণীদেহে তার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হয়। এরপর মানুষের ওপর ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালাতে হয়। শরীরে এটি কীভাবে কাজ করবে, কত মাত্রায় নিরাপদ, কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী—এসবও নিশ্চিত করতে হয়।
ফুমাজিলিনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও জটিল। কারণ যৌগটি আগে থেকেই পরিচিত এবং এর চিকিৎসাগত ব্যবহার নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট রোগে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও পরীক্ষা হয়েছে। তবে মানুষের শরীরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে পাটের ভেতরের ছত্রাক থেকে ফুমাজিলিন পাওয়া গেছে এই তথ্যকে সরাসরি নতুন ওষুধ আবিষ্কার বলা ঠিক হবে না।
তবে এই গবেষণার গুরুত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায় না। আসল বিষয় হলো বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভিদের ভেতরে থাকা অণুজীবগুলোকে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ওষুধের উৎস হিসেবে কতটা কাজে লাগাতে পারছেন। পাট আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। এত দিন পাট নিয়ে গবেষণার বড় অংশ ছিল আঁশ, উৎপাদন, রোগবালাই কিংবা শিল্পপণ্য ঘিরে। কিন্তু পাটগাছের ভেতরে বসবাসকারী অণুজীবের মধ্যেও যদি কার্যকর রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায়, তাহলে গবেষণার একটি নতুন দরজা খুলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সমস্যা বাড়ছে। কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বারবার ব্যবহার করতে করতে যখন জীবাণু তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে, তখন সাধারণ ওষুধ আর আগের মতো কাজ করে না। এই কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন জীবাণুরোধী পদার্থ খোঁজার প্রয়োজন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নতুন অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওষুধ তৈরির গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
বাংলাদেশের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশে তাই প্রশ্ন শুধু পাটের নয়। ধান, চা, ঔষধি গাছ, মাছ কিংবা অন্যান্য স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সঙ্গে বসবাসকারী অণুজীবের মধ্যেও কত রাসায়নিক সম্পদ লুকিয়ে আছে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। একটি গবেষণাগারে পাওয়া কোনো যৌগ হয়তো সরাসরি ওষুধ হবে না। কিন্তু সেটি ভবিষ্যতের বড় আবিষ্কারের সূত্রও হতে পারে।
আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধশিল্পের মধ্যে সহযোগিতা। কারণ গবেষণাগারে একটি কার্যকর যৌগ শনাক্ত করা হলো প্রথম ধাপ। এরপর শুরু হয় নিরাপত্তা পরীক্ষা, প্রাণীদেহে পরীক্ষা, মানুষের ওপর পরীক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত ওষুধ হিসেবে অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
তাই পাটের ভেতরের এই ছত্রাকের গল্পটি আজ নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের গল্প নয়। বরং এটি দেখায়, বাংলাদেশের পরিচিত একটি ফসলের একেবারে অদৃশ্য জগতেও এমন কিছু রাসায়নিক সম্পদ থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজে লাগতে পারে। পাট থেকে আমরা এত দিন আঁশ পেয়েছি; এখন হয়তো তার ভেতরের অণুজীব থেকেও বিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা খোঁজার সময় এসেছে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬