Loading...

শীতের আগে হামলা বাড়াচ্ছে রাশিয়া
ইউক্রেনের শহরে রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়ছে। শীত সামনে রেখে বিদ্যুৎ, উষ্ণতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো আর তাদের মস্কোর শর্তে শান্তি মানতে বাধ্য করা এক বিষয় নয়।


ইউক্রেনের শহরে রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়ছে। শীত সামনে রেখে বিদ্যুৎ, উষ্ণতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো আর তাদের মস্কোর শর্তে শান্তি মানতে বাধ্য করা এক বিষয় নয়। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সমঝোতার প্রতি আগ্রহ থাকলেও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন এবং নতুন ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবে প্রবল আপত্তি রয়েছে তাদের।
গার্ডিয়ানে ৫ অক্টোবরের কলামে রাজন মেনন লেখন, হামলা বাড়িয়েও ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধ ভাঙা কঠিন হবে। তার বিশ্লেষণে, যুদ্ধক্ষেত্রে অপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে শহরের মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর উদ্দেশ্য, দৈনন্দিন জীবন এতটা দুর্বিষহ করা, যাতে যুদ্ধ থামানোর জন্য ইউক্রেনীয়রা ভূখণ্ড ছাড়ার শর্ত মেনে নেন। তবে এই কৌশলের রাজনৈতিক ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মেনন।
মস্কো লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়াকে রাশিয়ার অংশ ঘোষণা করলেও চারটি অঞ্চলের পুরো ভূখণ্ড তার নিয়ন্ত্রণে নেই। মেননের বক্তব্য, এই লক্ষ্য অপূর্ণ থাকায় মানুষের সহনশীলতাকে যুদ্ধের আরেকটি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। কিন্তু সামরিক দখল, দখলের আইনি স্বীকৃতি এবং বেসামরিক মানুষের সম্মতি আলাদা বিষয়। শহরে হামলা বাড়িয়ে এই ব্যবধান মুছে ফেলা সহজ হবে না।
হামলা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায় ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর হিসাবে। মুখপাত্র ইউরি ইহনাত ২৯ সেপ্টেম্বর জানান, ওই মাসের তখন পর্যন্ত রাশিয়া ৩ হাজার ১৭৭টি জেটচালিত ড্রোন পাঠিয়েছে; আগস্টজুড়ে সংখ্যাটি ছিল ২ হাজার ৮৫০। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার আগেই আগের মাসের হিসাব ছাড়িয়ে যায়। কিয়েভ ও আশপাশের এলাকা প্রধান লক্ষ্য হলেও অন্য শহরগুলোও নিয়মিত হামলার মুখে রয়েছে।

এসব হামলায় আবাসিক এলাকা, বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরেছেন মেনন। তার সেপ্টেম্বরের সফরের অভিজ্ঞতায়, মিকোলাইভে এক রাতে বারবার সতর্কসংকেত এবং কিয়েভের কাছে ড্রোনের আঘাতে ভবনে আগুন দেখার বর্ণনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছোটা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও প্রাণহানির ভয় মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শান্তির শর্ত নিয়ে জনমতের ছবি একরৈখিক নয়। কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোসিওলজির ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের জরিপের চূড়ান্ত ফলে ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা রুশ শর্তের আদলে সাজানো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে দনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা সীমিত করা এবং ক্রিমিয়া ও দনবাসের ওপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব স্বীকারের শর্ত ছিল; নির্দিষ্ট নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না।
একই জরিপে ৬৯ শতাংশ নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ বর্তমান যুদ্ধরেখায় পরিস্থিতি স্থির করার প্রস্তাবে সম্মতি জানান। এই প্রস্তাবে দখল করা অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ছিল না। আবার বর্তমানে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করেন ৬৬ শতাংশ। ফলে সমঝোতার প্রতি সমর্থনকে রুশ দাবির প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জরিপটি করা হয় ২৬ নভেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত, ইউক্রেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের ১ হাজার ১ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে। দখল করা এলাকার বাসিন্দা এবং পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর বিদেশে চলে যাওয়া নাগরিকেরা এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। এটি গত বছরের জনমতের চিত্র; বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি পরিমাপ নয়। তবু শান্তির শর্তে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার গুরুত্ব বোঝাতে তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক।
মেননের মতে, অনেক ইউক্রেনীয় প্রতিরোধকে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখেন। তাদের আশঙ্কা, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো চুক্তি রাশিয়াকে বাহিনী পুনর্গঠন এবং আবার হামলার সুযোগ দিতে পারে। তাই যুদ্ধের ক্লান্তি বাড়লেও প্রতিরোধ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয় নয়। বোমাবর্ষণ মানুষের ক্ষতি করে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য আদায় করতে পারে না—এই সীমাবদ্ধতাই তার বিশ্লেষণের কেন্দ্র।

অন্যদিকে রাশিয়ার চাপও কম নয়। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা প্রধান রিচার্ড নাইটন সেপ্টেম্বর মাসে রুশ বাহিনীর মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ বলে দাবি করেন। এটি ব্রিটিশ হিসাব, স্বাধীনভাবে নিশ্চিত মোট সংখ্যা নয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ায় সেনা সংগ্রহ, ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া এবং সরঞ্জাম সরবরাহের প্রয়োজন বাড়ছে। মেননের বিশ্লেষণে, এসব ব্যয় মস্কোর সামরিক লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করছে।
রুশ সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের পাল্টা হামলাও এই চাপের অংশ। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার হামলার জবাবে তেল শোধনাগারে আঘাত বাড়াবে ইউক্রেন। মস্কো নিজের হামলাকে পাল্টা ব্যবস্থা বলছে; দুই পক্ষই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে। ফলে আকাশপথের এই লড়াইয়ে অবকাঠামো ও অর্থনীতির ক্ষতি আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।
রাশিয়ার ২০২৭ সালের খসড়া বাজেটেও দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি স্পষ্ট। জাতীয় প্রতিরক্ষায় প্রস্তাবিত বরাদ্দ ১৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন রুবল, যা মোট কেন্দ্রীয় ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর জনবলের চাহিদা এবং বেসামরিক খাতে শ্রমিকসংকটের চাপ যুক্ত হচ্ছে। মেননের মূল্যায়নে, জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি ও যুদ্ধের ব্যয় রুশ অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের দৃঢ়তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষায় ঘাটতি রয়েছে; বিদ্যুৎ ও গরম রাখার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শীতে বেসামরিক দুর্ভোগ বাড়বে। মেননের পূর্বাভাস, সেই দুর্ভোগও ইউক্রেনকে পুতিনের শর্তে শান্তি মানতে বাধ্য করবে না। শুধু মনোবল দিয়ে এই যুদ্ধের ফল নির্ধারিত হবে না। যুদ্ধের গতিপথ নির্ভর করবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বাইরের সহায়তা এবং কার্যকর নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ওপরও।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬