Loading...

চার বছরে মোট ঋণ কমেছে ২৩ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা ২৩ শতাংশের বেশি কমে ১৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে ঋণ কমার পুরো চিত্রটি বুঝতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিবর্তন আলাদাভাবে দেখতে হবে।


একসময় কম সুদে ডলার পাওয়া যাওয়ায় দেশের বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিদেশি ঋণ ছিল আকর্ষণীয় অর্থায়নের উৎস। সেই পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং প্রয়োজনের সময় ডলার পাওয়ার অনিশ্চয়তায় বেসরকারি খাত বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। নতুন ঋণ নেওয়া বা পুরোনো ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর বদলে অনেক প্রতিষ্ঠান আগের দায় পরিশোধে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা ২৩ শতাংশের বেশি কমে ১৯ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে ঋণ কমার পুরো চিত্রটি বুঝতে হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিবর্তন আলাদাভাবে দেখতে হবে।
সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণে। বায়ারস ক্রেডিট, বিলম্বিত আমদানি বিল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধাসহ এই ঋণের পরিমাণ ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের ১৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪২ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ১০ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মোট বেসরকারি বৈদেশিক ঋণে স্বল্পমেয়াদি দায়ের অংশও প্রায় ৬৮ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫০ শতাংশ হয়েছে।
এর বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে। ২০২০ সালের শুরুতে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়মিত নবায়নের চাপ এড়াতে পাঁচ থেকে দশ বছর মেয়াদি কাঠামোবদ্ধ প্রকল্প ঋণের দিকে ঝুঁকছে।

বিদেশি ঋণের ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক সুদের বেঞ্চমার্ক সোফর-এর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) উল্লম্ফন। ২০২১ সালে সোফর হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ১ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর এই হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশে। এর সঙ্গে ঋণদাতার ঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং বিদেশে পাঠানো সুদের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর যোগ হয়।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের ভাষ্য, বিদেশি ঋণের সুদ এখন ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে। তাঁর প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প—দুই ধরনের বিদেশি ঋণ নিলেও ২০২০-২১ সালের তুলনায় এর ব্যয় এখন অনেক বেশি।
টাকার অবমূল্যায়নও বিদেশি ঋণকে ব্যয়বহুল করেছে। ঋণ ডলারে নেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় মূলত টাকায়। ফলে ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ ঋণ ও সুদ পরিশোধে বেশি টাকা প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত সরবরাহ যোগ হওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়া এবং সময়মতো কিস্তি পরিশোধ—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদেশি ঋণ কমায় বৈদেশিক মুদ্রা ও পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে এটিকে সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক শক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও ট্রেড ক্রেডিট কমে যাওয়ার অর্থ হতে পারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি ও বিনিয়োগ পিছিয়ে দিচ্ছে, অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়ছে কিংবা কম উৎপাদনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ফলে বিদেশি ঋণের পতন একদিকে ঝুঁকি কমানোর কৌশল, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে দুর্বলতার সংকেতও।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬