Loading...

লক্ষ্য বড় পুঁজিতে
নীতিগত অনিশ্চয়তা, মুদ্রার অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের চাপ ও বিনিয়োগের অর্থ ফেরত নেওয়ার জটিলতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যে এবার কিছু নিয়ম সহজ করা হয়েছে।


নিউইয়র্কে গিয়ে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার বিনিয়োগ সুরক্ষা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি আস্থা ধরে রাখাটিও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট অবস্থান ছিল ঋণাত্মক ২২৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে ২২৩ কোটি ডলার বেশি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর আগের অর্থবছরেও নিট বহির্গমন ছিল ১৩৮ কোটি ডলার। টানা ষষ্ঠ অর্থবছর বিদেশি পুঁজিবাজার বিনিয়োগে বাংলাদেশ থেকে নিট অর্থ বেরিয়ে গেছে।
তবে এই হিসাবকে বাংলাদেশের সব ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের হিসাব আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে নিট এফডিআই এসেছে প্রায় ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে গেলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা, ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী তুলনামূলক দ্রুত টাকা তুলে নিতে পারেন। কিন্তু একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান যখন কারখানা তৈরি করে, প্রযুক্তি আনে কিংবা কোনো ব্যবসায় অংশীদার হয়, তখন সেটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। ফলে বাংলাদেশে এফডিআই থাকা মানেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের আস্থা ফিরে এসেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল বিনিয়োগের টাকা দেশে আনা ও ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রয়লব্ধ অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার নিয়ম সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো এবং কিছু অনুমোদন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের শেয়ারদর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সূচক নির্ধারক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারের নিয়মিত পর্যালোচনাও আবার শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর কিছু প্রভাব সেপ্টেম্বরের লেনদেনে দেখা গেছে। মাসের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন এবং প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফলে ওই সময়ে তাদের নিট কেনাকাটা ছিল প্রায় ৭০ কোটি টাকা। দীর্ঘ সময়ের বহির্গমনের পর এটি অবশ্যই একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তবে মাত্র এক মাসের লেনদেন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু শেয়ারের সম্ভাব্য লাভ দেখেন না। তারা দেখেন টাকা আনা ও নেওয়ার সুবিধা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা, কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা, করব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং নীতির ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব জায়গাতেই এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও ব্যবসার পরিবেশে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির একটি বড় কারণ। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসার পরিবেশকে কতটা নির্ভরযোগ্য করা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় হলো এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়লেও নতুন বিনিয়োগকারীরা কতটা নতুন অর্থ নিয়ে আসছেন। কোনো বিদেশি কোম্পানি তার আগের মুনাফা আবার বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করলে সেটিও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবে আসে। কিন্তু সেটি নতুন বিদেশি মূলধন আনার সমান নয়। ফলে শুধু মোট এফডিআই বাড়ছে কি না, সেটি দিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশের পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
এখানেই নিউইয়র্কের বৈঠকের গুরুত্ব। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের সামনে সম্ভাবনার তালিকা তুলে ধরছে। বড় বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিক অবস্থান, শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ—এসব বাংলাদেশের শক্তি। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তব বিনিয়োগ এক বিষয় নয়।
একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে অর্থ আনার আগে হিসাব করবেন এখানে বিনিয়োগ করলে তিনি কতটা সহজে ব্যবসা করতে পারবেন, তাঁর অর্থ কতটা নিরাপদ থাকবে, মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না এবং পাঁচ বছর পর নীতির পরিবেশ কেমন থাকবে।
সেপ্টেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনা বাড়া এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত কিছু নিয়ম সহজ করার উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য আরও সময় ও তথ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। একদিকে সরকার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দরজা আরও খুলতে চাইছে, অন্যদিকে বিদেশি পুঁজির দীর্ঘদিনের বহির্গমন দেখাচ্ছে যে শুধু আমন্ত্রণ যথেষ্ট নয়।
বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসতে বলা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা এসে অর্থ ধরে রাখতে এবং নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
নবোদয়/ আরআই/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬