Loading...

চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
পৃথিবীর গাড়ির গ্যারেজে গাড়ি আসে তেল বদলাতে, যন্ত্র সারাতে বা নতুন অংশ লাগাতে। ভবিষ্যতের মহাকাশে সেবাদানকারী মহাকাশযান একই ধরনের কাজ করবে।


মহাকাশে পাঠানো একটি উপগ্রহ একসময় তার জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলবে, কক্ষপথ নিচে নামতে শুরু করবে, কোনো যন্ত্র নষ্ট হতে পারে কিংবা নতুন প্রযুক্তি আসায় পুরোনো হয়ে যেতে পারে। এতদিন এমন হলে সাধারণত উপগ্রহটির কাজ শেষ। সেটিকে আর উদ্ধার করার সুযোগ ছিল না, নতুন উপগ্রহ পাঠানোই ছিল সমাধান।
এখন সেই ধারণা বদলানোর চেষ্টা চলছে। পৃথিবীর কক্ষপথে গিয়ে পুরোনো উপগ্রহকে ধরে তার কক্ষপথ বাড়াবে, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত চালনা ব্যবস্থা দেবে, পরবর্তী সময়ে মেরামত বা অন্য কাজেও যুক্ত হবে এমন রোবটিক মহাকাশযান তৈরির বাণিজ্যিক শিল্প গড়ে উঠছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে এই ভবিষ্যতের একটি বাস্তব পরীক্ষা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস। লক্ষ্য ছিল ২১ বছর ধরে পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা নিল গেরেলস সুইফট অবজারভেটরিকে কক্ষপথে আরও ওপরে তুলে এর কার্যকাল বাড়ানো।
ক্যাটালিস্টের তৈরি ৪০০ কেজির রোবটিক মহাকাশযান ‘লিংক’কে পাঠানো হয়েছিল সুইফটকে খুঁজে বের করে কাছে গিয়ে আঁকড়ে ধরার জন্য। এরপর তিনটি রোবটিক বাহু ব্যবহার করে সেটিকে ধীরে ধীরে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে তোলার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু মহাকাশে পৌঁছানোর পর পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়নি। ৩ জুলাই ২০২৬ লিংক উৎক্ষেপণের পর কিছু সময় ঠিকঠাক চললেও এর দিকনির্দেশনা ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে লিংকের তিনটি ঘূর্ণন-নিয়ন্ত্রণ চাকার মধ্যে দুটি কাজ করছিল না। ঠান্ডা গ্যাসভিত্তিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ফলে মহাকাশযানটিকে নিরাপদে সুইফটের কাছে নিয়ে গিয়ে ধরার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়।
তারপরও মিশনটি পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায়নি। আগস্টে নাসা জানায়, লিংককে সুইফটের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে এবং যতগুলো সম্ভব প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালানো হবে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিংক সুইফটের ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। তার তিনটি রোবটিক বাহু খোলা ও পরিচালনা করা হয়। একই সময়ে তিনটি বৈদ্যুতিক চালনা-ইঞ্জিনও চালানো হয়। কিন্তু এর বেশি কাছে গিয়ে সুইফটকে ধরার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ লিংক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে। ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নাসার মূল্যায়নে বলা হয়, সুইফটকে কক্ষপথে তুলতে না পারলেও মিশনটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত মহাকাশ-সেবা প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। এক বছরেরও কম সময়ে ক্যাটালিস্টকে রোবটিক মহাকাশযানটির নকশা, নির্মাণ, পরীক্ষা ও উৎক্ষেপণ করতে হয়েছিল। নাসার কাছে এটিও ছিল পরীক্ষার একটি বড় অংশ যে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কি দ্রুত কোনো পুরোনো মহাকাশযানের কাছে গিয়ে সেটির সঙ্গে কাজ করতে পারে?
সুইফটের ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ আছে। এটি এমন একটি উপগ্রহ, যেটি নিজে থেকে কক্ষপথ ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত চালনা ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয়নি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা হলেও নিম্নকক্ষপথের উপগ্রহের ওপর সামান্য টান তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সেই টানের কারণে কক্ষপথের উচ্চতা কমতে থাকে। ২০২৬ সালের বাড়তি সৌর কার্যকলাপের কারণে বায়ুমণ্ডলীয় টান আরও বেড়ে যাওয়ায় সুইফট দ্রুত নিচে নামছিল। অর্থাৎ উপগ্রহটি তখনো বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যবান, কিন্তু তার কার্যকাল শেষ হওয়ার পথে ছিল।
এই সমস্যার সমাধানই ভবিষ্যতের মহাকাশ-সেবার বাজার তৈরি করছে। একটি পুরোনো উপগ্রহকে পুরোপুরি বদলে নতুন উপগ্রহ পাঠানোর বদলে কোনো সেবাদানকারী মহাকাশযান গিয়ে তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নিজস্ব চালনা ব্যবস্থা ব্যবহার করে উপগ্রহটিকে কক্ষপথে ধরে রাখতে পারে। প্রয়োজনে নতুন চালনা-যন্ত্র যুক্ত করা, যন্ত্র পরীক্ষা করা কিংবা অন্য ধরনের মেরামত করাও ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
এর বাস্তব উদাহরণও ইতোমধ্যে আছে। নর্থরপ গ্রুম্যানের ‘মিশন এক্সটেনশন ভেহিকল’ জিওস্টেশনারি কক্ষপথে থাকা বাণিজ্যিক উপগ্রহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের নিজস্ব চালনা ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। নাসার ২০২৫ সালের মহাকাশ-সেবা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা ইতোমধ্যে দুটি ইনটেলস্যাট উপগ্রহের কার্যকাল বাড়িয়েছে। অর্থাৎ কক্ষপথে উপগ্রহকে ধরে রাখা এখন আর কেবল পরীক্ষাগারের ধারণা নয়।
২০২৬ সালেই আরও একটি বড় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ২১ জুলাই ২০২৬ নর্থরপ গ্রুম্যানের একটি রোবটিক মহাকাশযান স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর নাম ‘মিশন রোবোটিক ভেহিকল’, সংক্ষেপে এমআরভি। এতে নাসার সহায়তায় তৈরি রোবটিক সেবাদান প্রযুক্তি রয়েছে। ডারপা-সমর্থিত এই ব্যবস্থায় দুটি রোবটিক বাহু ব্যবহার করে জিওস্টেশনারি কক্ষপথের উপগ্রহ পরীক্ষা ও সেবা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রয়োজনে পুরোনো উপগ্রহে ছোট চালনা-যন্ত্রের একটি মডিউল, যাকে ‘মিশন এক্সটেনশন পড’ বলা হয়, যুক্ত করে তার কার্যকাল কয়েক বছর বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই প্রযুক্তি সফল হলে মহাকাশের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ একটি উপগ্রহ বানানো ও উৎক্ষেপণের খরচ কম নয়। অথচ অনেক সময় উপগ্রহের সব যন্ত্র নষ্ট হয়ে যায় না; শুধু জ্বালানি শেষ হয়ে যায় বা কক্ষপথ ঠিক রাখার সক্ষমতা হারায়। তখন কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের একটি সম্পূর্ণ উপগ্রহ ফেলে না দিয়ে একটি সেবাদানকারী মহাকাশযান দিয়ে সেটিকে আরও কয়েক বছর চালানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
এর সঙ্গে মহাকাশের বর্জ্যের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। পৃথিবীর কক্ষপথে যত বেশি উপগ্রহ ও মহাকাশযান জমছে, পুরোনো এবং অকার্যকর বস্তু তত বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। যে প্রযুক্তি আজ একটি সক্রিয় উপগ্রহকে বাঁচাতে ব্যবহার করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই অকার্যকর বস্তু কক্ষপথ থেকে সরিয়ে নেওয়া, এক কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষপথে স্থানান্তর কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে আনার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। নাসার মহাকাশ-সেবা কর্মসূচিও কার্যকাল বাড়ানো ও কক্ষপথের আবর্জনা কমানোকে একই প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ হিসেবে দেখছে।
এখানেই মহাকাশের গ্যারেজ ধারণাটির অর্থ। পৃথিবীর গাড়ির গ্যারেজে গাড়ি আসে তেল বদলাতে, যন্ত্র সারাতে বা নতুন অংশ লাগাতে। ভবিষ্যতের মহাকাশে সেবাদানকারী মহাকাশযান একই ধরনের কাজ করবে।
সুইফটের ক্ষেত্রে সেই গ্যারেজ এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি। রোবট গিয়ে পুরোনো উপগ্রহকে ধরতে পারেনি। কিন্তু পরীক্ষাটি দেখিয়েছে, মহাকাশে একটি বেসরকারি রোবট পাঠিয়ে একটি চলমান উপগ্রহের কাছে পৌঁছানো, সেটিকে শনাক্ত করা এবং কাছাকাছি অবস্থানে পরিচালনা করা সম্ভব। একই সময়ে অন্য একটি বাণিজ্যিক রোবটিক সেবাদান ব্যবস্থা বাস্তব মহাকাশ মিশনে যাচ্ছে।
আজকের মহাকাশ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হয় উপগ্রহ বানানো ও উৎক্ষেপণে। আগামী দিনের একটি বড় ব্যবসা হতে পারে সেই উপগ্রহকে আরও কয়েক বছর বাঁচিয়ে রাখা। তখন মহাকাশে নতুন কিছু পাঠানোর পাশাপাশি পুরোনো জিনিস বাঁচানোর বাজারও তৈরি হবে। অর্থাৎ মহাকাশে হয়তো সত্যিই গড়ে উঠছে নতুন ধরনের গ্যারেজ যেখানে মেরামতের জন্য যানবাহন থামবে না, বরং গ্যারেজই ছুটে যাবে উপগ্রহের কাছে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬