Loading...

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন। গত বছরের একই সময়ে সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২। কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩০৪ জন, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কম।


বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সংকট এখন দুটি জায়গায়। প্রচলিত গন্তব্যে নিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প বাজারের উপযোগী দক্ষতার ঘাটতি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জন।
গত বছরের একই সময়ে সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২। কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩০৪ জন, আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কম। নতুন কর্মীর এই প্রবাহ কমলেও সব দেশেই পরিস্থিতি এক নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব এখনো প্রধান ভরসা। সেপ্টেম্বরে দেশটির জন্য ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩২ হাজার ৯১৫ জন; কাতারে ৬ হাজার ২৮২ এবং কুয়েতে ৪ হাজার ৫৩৮ জন। তবে নিয়োগকারীদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা নিয়োগ কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। ফলে বাজার সচল থাকলেও ভবিষ্যৎ চাহিদা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্বল্পদক্ষ কর্মী নিয়োগে সীমাবদ্ধতা আছে। তবু সেপ্টেম্বরে ৪ হাজার ৪৪২ জনের ছাড়পত্র হয়েছে। অন্যদিকে, ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, আমিরাত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়েছে। এতে নতুন নিয়োগের পাশাপাশি আগে থেকে থাকা কর্মীদের জীবিকাও অনিশ্চিত হচ্ছে। বাহরাইনে ২০১৮ সাল থেকে নতুন শ্রমভিসায় স্থবিরতা চলছে; প্রবাসীদের পরিবার ও ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ওমানের অবস্থাও পেশাভেদে আলাদা। দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধের মধ্যে চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ কিছু শ্রেণিতে ভিসার ছাড় আছে। আগস্টে নিবন্ধিত কৃষি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঁচ হাজার বাংলাদেশি কৃষিকর্মীর কোটা ও ভিসা আবেদনের উদ্যোগ এসেছে। এটি নির্দিষ্ট খাত ও অনুমোদিত নিয়োগকর্তার সুযোগ।
মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ স্থবিরতার পর পরিবর্তন এসেছে। মঙ্গলবাল (৬ অক্টোবর) মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রকৃত চাহিদাপত্র যাচাই ও সত্যায়ন হলে বেসরকারি এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে। বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ আলাদা। সরকারের ভাষ্যমতে, দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ে উদ্বেগ বাজার পুনরুদ্ধারে বড় বাধা ছিল। নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তব চাকরি, বৈধ ভিসা এবং অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর।
লাওসে বাংলাদেশিদের নতুন কর্মী নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমভিসা ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত। দেশটির কর্তৃপক্ষ অবৈধ প্রবেশ, মানবপাচার ও অননুমোদিত শ্রমিক নিয়োগ ঠেকানোর কারণ দেখিয়েছে। তবে বাংলাদেশিদের নিয়ে বিশেষভাবে কোনো ব্যাখ্যা ওই নির্দেশনায় নেই।
মালদ্বীপে আবার ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যবসা বা বিশেষ ভিসায় প্রবেশের পর কর্মভিসায় পরিবর্তনের পথ বন্ধ করা হয়েছে। তবে এ বিধিনিষেধ সব বিদেশির জন্য; বাংলাদেশিদের ওপর একক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া এবং সুদানের মতো সংঘাতপ্রবণ গন্তব্যে বড় সমস্যা নিরাপত্তা। সশস্ত্র সহিংসতা, অপহরণ ও দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা সেখানে কাজের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কতা রয়েছে। কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্তে চাকরির পাশাপাশি নিরাপদ চলাচল ও জরুরি সহায়তার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এশিয়ায় তুলনামূলক সচল গন্তব্য সিঙ্গাপুর। সেপ্টেম্বরে দেশটির জন্য ৮ হাজার ৩০৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের নিয়মে বাংলাদেশ অনুমোদিত উৎসদেশ। নির্মাণ ও নির্দিষ্ট উৎপাদন এবং সেবা পেশায় নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে খাতভিত্তিক কোটা, অনুমোদিত পেশা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের শর্ত মানতে হয়। সুযোগ আছে, প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রিত। নির্দিষ্ট উৎপাদন ও সেবাপেশার এনটিএস তালিকায় কর্মীদের নির্ধারিত মাসিক বেতন কমপক্ষে দুই হাজার সিঙ্গাপুর ডলার হতে হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বোয়েসেলের ইপিএস প্রক্রিয়া এবং জাপানে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচি সম্ভাবনাময় পথ। জাপানের সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে জাপানি ভাষা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কোরিয়ার নিয়োগেও ভাষা পরীক্ষা ও নিয়োগকর্তার নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রশিক্ষণ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রকৃত চাকরির সঙ্গে মিল তৈরি ছাড়া এ বাজারগুলোতে বড় পরিসরে প্রবেশ কঠিন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৬ সালে ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ৩২০ ওন।
ইউরোপে ইতালি ও পর্তুগালে কিছু ইতিবাচক প্রবাহ দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে ইতালির জন্য ১ হাজার ৯৭ এবং পর্তুগালের জন্য ১ হাজার ২৪৯ জনের ছাড়পত্র হয়েছে। আগের মাসের তুলনায় উভয় দেশেই সংখ্যা বেড়েছে। তবে বাংলাদেশের মোট কর্মী গমনের তুলনায় আকার এখনো ছোট। দেশ ও পেশাভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি দরকার।
তবে দক্ষতার হিসাবে ঘাটতি স্পষ্ট। বিএমইটির ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, বিদেশগামীদের ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম দক্ষ, ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ দক্ষ এবং ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পেশাজীবী। অর্থাৎ দক্ষ ও পেশাজীবী মিলিয়ে প্রায় ২২ শতাংশ। এই হিসাব বিদেশগামী কর্মীদের; দেশের মোট দক্ষ জনশক্তির পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।
বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদও ভাষা ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতার কথা বলেছেন। তার মতে, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণসুবিধার ঘাটতি আছে। জাপানমুখী কর্মসংস্থানের জন্য মন্ত্রণালয়ের জাপান সেল ভাষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের ফল মাপতে হবে কতজন প্রশিক্ষণ পেলেন, স্বীকৃত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন এবং চাকরি পেলেন, সেই তথ্য দিয়ে।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য জানিয়েছে। এই লক্ষ্যের গড় বছরে বিশ লাখ কর্মসংস্থান, চলতি প্রবাহের সঙ্গে যার বড় ব্যবধান। লক্ষ্য অর্জনে বন্ধ বা সীমিত বাজার নিয়ে কার্যকর কূটনীতি, নিয়োগকর্তার চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ এবং নিয়োগব্যয়ের স্বচ্ছতা জরুরি।
পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী বেতন, কাজের অস্তিত্ব ও অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বেশি গন্তব্যে নিয়মিত কর্মসংস্থান এবং দক্ষতার ভিত্তিতে ভালো কাজের অংশ বাড়ানো।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬