Loading...

সায়েন্সল্যাবে ঢাকা কলেজ–আইডিয়াল কলেজ সংঘর্ষ
কলেজের নাম ঘিরে গর্ব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিচয় যখন অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শেখায়, তখন সামান্য বিরোধও শ্রেণিকক্ষ পেরিয়ে রাস্তায় গড়ায়। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ইতিহাস সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। শিক্ষার্থীদের বারবার এই সহিংসতা থামানোর দায়িত্ব কার?


কলেজের নাম ঘিরে গর্ব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিচয় যখন অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শেখায়, তখন সামান্য বিরোধও শ্রেণিকক্ষ পেরিয়ে রাস্তায় গড়ায়। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ইতিহাস সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। শিক্ষার্থীদের বারবার এই সহিংসতা থামানোর দায়িত্ব কার?
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। স্ট্রিমের প্রতিবেদনে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুবের বরাতে গণমাধ্যমকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে নিউমার্কেট, কলাবাগান ও ধানমন্ডি থানার প্রায় ৬০ পুলিশ সদস্য এলাকায় অবস্থান নেন। পরে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কলেজে ফিরে যান।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের একটি বাসে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা ইট ছোড়েন; বাসের কাচও ভাঙে। অন্যদিকে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরাই বিনা উসকানিতে তাদের ওপর হামলা চালান। এগুলো দুই পক্ষের অভিযোগ—কোনটি ঘটনার সূত্রপাত, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

এই এলাকায় সংঘর্ষের নজির অনেক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফা সংঘর্ষে জড়ান। ওই বছরের নভেম্বরে মুখোমুখি হন ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কোচিং সেন্টারের সিঁড়িতে ধাক্কা লাগা নিয়ে এই দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে সংঘর্ষ হয় সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
ছোট বিরোধ কীভাবে বড় হয়, তার আরেকটি উদাহরণ গত বছরের আগস্ট। পুলিশ তখন জানায়, একটি কোচিং সেন্টারের পরিচয়পত্র নিয়ে ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর ঝামেলা থেকে পরে প্রায় দেড় ঘণ্টার সংঘর্ষ বাধে। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিরোধে জড়িতদের বাইরেও অন্য শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে যোগ দেন, আর ভোগান্তিতে পড়েন পথচারী ও যাত্রীরা।
সংঘাত মেটানোর চেষ্টাও হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর পুলিশের মধ্যস্থতায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ভবিষ্যতে বিবাদে না জড়ানোর মৌখিক অঙ্গীকার করেন। অনুষ্ঠানে সিটি কলেজ যোগ দেয়নি। ঠিক এক মাস পর, ৯ ডিসেম্বর, ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা আবার সংঘর্ষে জড়ান। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারিতেও একই দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়।
সমস্যা কেবল দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও সীমিত নয়। গত জুলাইয়ে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর তিনজনের আবাসিক হলের আসন বাতিল করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ঢাকার বাইরে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে ওমরগণি এমইএস কলেজ ও ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলার বল লাগাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। চট্টগ্রামের ঘটনাটিতে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও জড়িত ছিল।

তাহলে কেন বারবার এমন হচ্ছে? তিন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে গণমাধ্যমের একাধিক অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানকে ‘সেরা’ প্রমাণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পুরোনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিরোধের ধারা পাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির কথা উঠে এসেছিল। এছাড়াও ব্যক্তিগত বিরোধ বড় দলে ছড়িয়ে পড়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবের কথা এসেছে।
কিশোরদের দলগত আচরণও এখানে বিবেচ্য। ইউনিসেফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মনোবিজ্ঞানী লিসা দামুর বলেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কিশোরেরা ঝুঁকি নিয়ে তুলনামূলক কম সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে বয়স বা আবেগ দিয়ে ইট ছোড়া, মারধর কিংবা ভাঙচুরের দায় এড়ানো যায় না। সংঘর্ষে কারা কী করেছেন, তা শনাক্ত করে তাদের আচরণের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দায় তাই এক পক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীর নিজের কাজের দায় আছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বিরোধ শুরুতেই চিহ্নিত করা, অভিযোগ শোনা এবং প্রমাণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখলে কথা বলা। আর পুলিশের দায়িত্ব সংঘর্ষ ও পথচারীদের ঝুঁকি ঠেকানো এবং হামলা বা ভাঙচুরের অভিযোগ তদন্ত করা। শুধু সংঘর্ষের দিন শিক্ষার্থীদের কলেজে ফেরালেই পরের দিনের বিরোধ মেটে না।
শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের ভূমিকাও এখানেই। ইউনেসকোর মতে, শিক্ষার্থী সহিংসতা রোধে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ পরিবেশ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা শেখানো একসঙ্গে প্রয়োজন। সায়েন্স ল্যাব এলাকার কলেজগুলোর ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রয়োগ হতে পারে তিন প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত যৌথ বৈঠক, বিরোধ জানানোর নির্ভরযোগ্য পথ এবং সংঘর্ষে জড়িতদের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
নবোদয়/ এসএন/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬