Loading...

খালি পড়ে আছে ঘর
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের ঘটনা এর বড় উদাহরণ। পদ্মার দুর্গম চরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর ৫৪০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫১০টি ঘরেই কেউ বসবাস করেন না। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রায় ৯৪ শতাংশ ঘর খালি পড়ে আছে।


ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্প। সারি সারি ঘর, সামনে খোলা জায়গা, কোথাও নলকূপ, কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নতুন একটি জনপদ গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে যেখানে ঘর আছে, অথচ মানুষ নেই।
কোথাও অধিকাংশ ঘর তালাবদ্ধ, কোথাও উপকারভোগীরা ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন, আবার কোথাও নির্মাণের পর থেকেই ঘর পড়ে আছে খালি। সময়ের সঙ্গে পরিত্যক্ত ঘরগুলোতে জন্মেছে আগাছা, নষ্ট হয়েছে দরজা-জানালা, কোথাও আবার ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন এলাকার তথ্য বলছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ব্যর্থতার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। কোথাও প্রকল্প হয়েছে দুর্গম চরাঞ্চলে, কিন্তু সেখানে যাওয়ার রাস্তা নেই। কোথাও সুপেয় পানি নেই, কোথাও বিদ্যুৎ থাকলেও সংযোগ নেই। আবার কোনো কোনো প্রকল্পে আশপাশে কাজের সুযোগ না থাকায় উপকারভোগীরা সেখানে বসবাস করতে পারছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিচু বা নদীভাঙনপ্রবণ জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, নির্মাণের মান নিয়ে অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং কোথাও কোথাও উপকারভোগী নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের ঘটনা এর বড় উদাহরণ। পদ্মার দুর্গম চরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর ৫৪০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫১০টি ঘরেই কেউ বসবাস করেন না। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রায় ৯৪ শতাংশ ঘর খালি পড়ে আছে।
প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সড়ক নেই, আশপাশে জনবসতিও কম। বর্ষায় চরের রাস্তা কাদা ও পানিতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে ভূমিহীন পরিবারকে ঘর ও জমি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানে গিয়ে বসবাস করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেকে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দুর্গম চরাঞ্চল এবং যোগাযোগব্যবস্থার অভাব মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।
খুলনার কয়রা উপজেলায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর চরে ছয় কোটি ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো তদারকি ও সংস্কারের অভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেখানে সুপেয় পানি, চলাচলের রাস্তা, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।

কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২২০টি ঘরের মধ্যে ১০০টিতেই কেউ থাকেন না বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন। নদীর জোয়ারে ঘরের মাটি সরে গেছে, নলকূপ নষ্ট হয়ে গেছে, যোগাযোগের রাস্তা নেই। ফলে যাঁদের জন্য ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই সেখানে থাকতে চাইছেন না।
এখানেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল দুর্বলতার একটি দিক সামনে আসে। শুধু ঘর নির্মাণ করলেই একটি পরিবারকে পুনর্বাসন করা যায় না। একটি পরিবারকে যদি এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তার কাজ নেই, বাজার নেই, স্কুল বা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই এবং যাতায়াতের রাস্তা নেই, তাহলে ঘরটি যতই ভালো হোক, সেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করা কঠিন। ফলে অনেক পরিবার কাগজে-কলমে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হলেও বাস্তবে অন্যত্র বসবাস করছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রাঙারচর ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পেও এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে ১৯৯টি ঘরের মধ্যে অনেক ঘর খালি পড়ে থাকার তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তত ৪০টি ঘরে কেউ থাকেন না। প্রকল্পের কিছু ঘরে এমন ব্যক্তিরাও থাকছেন যাঁদের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে উপকারভোগী নির্বাচনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব থাকার অভিযোগও এসেছে। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর খালি থাকার আরেকটি কারণ হচ্ছে জীবিকার প্রশ্ন। একজন দিনমজুর, কৃষক, জেলে বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে যদি তাঁর পরিচিত কর্মস্থল ও জীবিকার উৎস থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে নতুন ঘর পেলেও তাঁর আয়-রোজগারের নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আগের কর্মস্থলের কাছাকাছি ফিরে যায়। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তাই আবাসনের সঙ্গে জীবিকার সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জামালপুরের সরিষাবাড়ির একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছিল। দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর উপকারভোগীদের অনেকে ঘর ছেড়ে চলে যান। এক বছরের মধ্যেই অনেক ঘরে ফাটল দেখা দেয়, ছিল সুপেয় পানির সংকট এবং সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ত। ঘর খালি পড়ে থাকায় সেগুলো স্থানীয়দের বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি মাদকসেবীদের আড্ডার স্থান হয়ে ওঠার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছিল।
অর্থাৎ প্রকল্পের সাফল্য পরিমাপ করার ক্ষেত্রে শুধু কতটি ঘর নির্মাণ হয়েছে কিংবা কত পরিবারকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—এই হিসাব যথেষ্ট নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, বরাদ্দ পাওয়া পরিবার কত বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে, তাদের আয়-রোজগারের অবস্থা কী, সন্তানরা স্কুলে যেতে পারছে কি না, চিকিৎসা সুবিধা কতটা কাছে এবং ঘরগুলো এখনো বসবাসযোগ্য কি না।
আশ্রয়ণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি অবশ্য নির্মাণের মান ও স্থান নির্বাচন নিয়ে। ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের একটি অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচন এবং প্রকৌশলগত তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠে আসে। ওই অনুসন্ধানে অন্তত ২২ জেলার ৩৬টি উপজেলায় অনিয়মের অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল। কোথাও ঘর নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই দেয়ালে ফাটল দেখা যায়, কোথাও মাটি দেবে গিয়ে ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার কোথাও ঘরের অংশবিশেষ ধসে পড়ে।
তখন প্রকৌশলীদের বক্তব্য ছিল, অনেক প্রকল্প নিচু ও নরম মাটিতে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাকশন করা হয়নি। ফলে বৃষ্টি ও পানির চাপে মাটি সরে গিয়ে ঘরের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থপতি ইকবাল হাবিবও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও পরিবেশ এক নয়। অথচ একই ধরনের নকশা সব এলাকায় প্রয়োগ করা হলে স্থানীয় ভূপ্রকৃতির সঙ্গে ঘরের কাঠামোর সামঞ্জস্য নষ্ট হতে পারে।
নির্মাণ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২১ সালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘরের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রকৌশলীদের মতে, সেই সময়ের বাজারদরের তুলনায় নির্ধারিত বাজেট অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত ছিল। কোথাও কংক্রিটের পরিবর্তে ইটের ভিত্তি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বরগুনার আমতলীতে শতাধিক ঘরে কাঠামোগত সমস্যার কথাও তখন প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে পুরোনো এসব অভিযোগের পাশাপাশি নতুন সমস্যাও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনার চরে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭৯টি পরিবারের ঘর নদীভাঙনের মুখে পড়ে। কয়েকটি ঘর নদীগর্ভে চলে যায় এবং আরও অনেক ঘর ঝুঁকিতে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, চরটি যে ভাঙনপ্রবণ তা জানা সত্ত্বেও সেখানে ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু পরিবার নিজেরাই ঘরের ইট, টিন ও অন্যান্য উপকরণ খুলে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়।
এ ধরনের ঘটনা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে। ভূমিহীন মানুষকে নিরাপদ জায়গায় পুনর্বাসনের জন্য যে প্রকল্প, সেটিই যদি নদীভাঙন, বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সেই পুনর্বাসন কতটা টেকসই?
বাংলাদেশের মতো বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ দেশে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এক পর্যায়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে কোমরসমান পানি উঠে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, নিচু জায়গায় পর্যাপ্ত মাটি না ভরাট করেই ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে আশপাশের এলাকায় পানি না উঠলেও প্রকল্পের ঘরে পানি ঢুকে পড়ে।

আবার ২০২৬ সালে খুলনার ডুমুরিয়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে নতুন ধরনের সংকট দেখা গেছে। ভদ্রা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পাশে ও কিছু ক্ষেত্রে ঘরের ওপর জমা হওয়ায় দেয়ালে ফাটল, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বসবাসের পরিবেশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল জলাবদ্ধতা কমানো, কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি সরকারি প্রকল্পের কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রও ঘটনাটিকে প্রকল্প পরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এখানে আরেকটি সমস্যা হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ। একটি সরকারি ঘর নির্মাণ করে পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে কয়েক বছর পর সেটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নদী, উপকূল বা জলাবদ্ধ এলাকার ঘরগুলোর জন্য নিয়মিত মেরামত, বাঁধ রক্ষা, পানি নিষ্কাশন, রাস্তা সংস্কার এবং নিরাপদ পানি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। এসব ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষ ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে চলে যায়।
কিছু এলাকায় আবার ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনের প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি নিজে না থেকে অন্য কেউ ঘরে বসবাস করছেন, কোথাও ঘর খালি পড়ে আছে, আবার কোথাও প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার ঘর পাওয়ার দাবি করছে। ঠাকুরগাঁওয়ের একটি প্রকল্পে ১৫১টি ঘরের মধ্যে ৯৬টি ফাঁকা থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বরাদ্দ পাওয়া কিছু পরিবার সেখানে না থাকলেও অন্য কিছু পরিবার আশ্রয় হিসেবে ওই ঘরে বসবাস করছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও প্রকল্পটির প্রত্যন্ত অবস্থান ও দূরের বাসিন্দাদের বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি সমস্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ আশ্রয়ণ প্রকল্পের সংকটকে শুধু ‘মানুষ ঘরে থাকতে চায় না’ এভাবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়াল হয়ে যায়। মানুষ কেন থাকছে না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
যদি একটি ঘরের পাশে রাস্তা না থাকে, তাহলে সেখানে বাজারে যাওয়া কঠিন। যদি কর্মসংস্থান না থাকে, তাহলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদি স্কুল দূরে হয়, শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। যদি চিকিৎসাকেন্দ্র দূরে হয়, অসুস্থ মানুষ বিপদে পড়ে। যদি নিরাপদ পানি না থাকে, তাহলে বসবাসের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়। আবার যদি জায়গাটি বন্যা বা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেবে না।
আর ঘর নির্মাণের মান খারাপ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। কারণ আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাঁরা যান, তাঁদের অধিকাংশেরই নতুন করে ঘর নির্মাণ বা বড় ধরনের মেরামত করার আর্থিক সক্ষমতা থাকে না। ফলে সরকারি ঘরটি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁদের আবারও অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়।
এ কারণেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু ‘কতটি ঘর তৈরি হয়েছে’ দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং কতটি পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, কতটি ঘর খালি, কতটি ঘর বসবাসের উপযোগী, কতজন উপকারভোগীর আয় বেড়েছে, কতজনের সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, কতটি প্রকল্পে নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আছে এবং কতটি প্রকল্প নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে এসব সূচক দিয়ে প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সরকারি উদ্যোগ হিসেবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষকে জমি ও ঘর দিয়ে পুনর্বাসন করা। ১৯৯৭ সাল থেকে জুলাই ২০২৩ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে এই প্রকল্পের আওতায় ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের তথ্য দিয়েছে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র। ফলে এটি ছোট কোনো আবাসন প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন সরাসরি জড়িত।
এই বিশাল কর্মসূচির ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন ঘর নির্মাণ নয়, বরং নির্মিত ঘরগুলোকে টেকসই জনপদে পরিণত করা।
একটি ঘর একজন মানুষকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারে, কিন্তু একটি টেকসই জনপদ একটি পরিবারকে জীবন গড়ার সুযোগ দেয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পে যদি ঘর থাকে কিন্তু রাস্তা না থাকে, ঘর থাকে কিন্তু কাজ না থাকে, বিদ্যুৎ থাকে কিন্তু সংযোগ না থাকে, নলকূপ থাকে কিন্তু পানি না থাকে, জমি থাকে কিন্তু নিরাপত্তা না থাকে তাহলে সেটি আবাসন হতে পারে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খালি পড়ে থাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো তাই শুধু পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়; এগুলো সরকারি পুনর্বাসন পরিকল্পনার একটি বড় শিক্ষা। কোথায় প্রকল্প করা হচ্ছে, কাদের সেখানে নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের জীবিকা কী হবে, দুর্যোগের ঝুঁকি কতটা, নির্মাণের মান কেমন, এবং নির্মাণের পর কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্প অনুমোদনের আগেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নইলে কাগজে হাজার হাজার পরিবারকে ঘর দেওয়ার সাফল্যের হিসাব থাকলেও মাঠে দেখা যাবে তালাবদ্ধ ঘর, আগাছায় ঢাকা উঠান আর জনমানবহীন নতুন জনপদ। আর তখন প্রশ্ন উঠবেই যাদের জন্য ঘর, তারা যদি ঘরেই না থাকে, তাহলে সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের আসল সাফল্য কোথায়?
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ০১ অক্টোবর ২০২৬