Loading...

জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন বিশ্বের অন্যতম দৃশ্যমান কূটনৈতিক পদ। ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের এই মঞ্চে এক বছরের জন্য সভা পরিচালনা, আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সভাপতির। এবার সেই দায়িত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই পদ বাংলাদেশের জন্য কতটা বাস্তব সুবিধা তৈরি করতে পারে, আর কতটা কেবল কূটনৈতিক মর্যাদার বিষয়?


জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন বিশ্বের অন্যতম দৃশ্যমান কূটনৈতিক পদ। ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের এই মঞ্চে এক বছরের জন্য সভা পরিচালনা, আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে সভাপতির। এবার সেই দায়িত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই পদ বাংলাদেশের জন্য কতটা বাস্তব সুবিধা তৈরি করতে পারে, আর কতটা কেবল কূটনৈতিক মর্যাদার বিষয়?
গত ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকুরিসকে হারান খলিলুর রহমান। গোপন ভোটে তিনি পান ৯৯ ভোট, কাকুরিস পান ৯১ ভোট। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত এবারের সভাপতিত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনেই জয় পান বাংলাদেশের প্রার্থী।
তবে জুনে নির্বাচিত হলেও দায়িত্ব শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর। বর্তমানে তিনিই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এবং তার মেয়াদ চলবে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য, ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান প্লেনারি বৈঠক আহ্বান ও পরিচালনা করবেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও পরামর্শ এগিয়ে নেবেন এবং সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের একমাত্র প্রধান অঙ্গ, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে এই পদ ব্যবহার করতে পারেন না। জাতিসংঘের আচরণবিধি অনুযায়ী, তাকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং কোনো রাষ্ট্রকে অযৌক্তিক বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে নিজেকে প্রত্যাহারও করতে হয়।
ফলে এই পদ ব্যবহার করে সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর এককভাবে চাপ সৃষ্টি করা কিংবা জলবায়ু তহবিল থেকে বাংলাদেশের জন্য অর্থ ছাড় করিয়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা সভাপতির নেই।
তাহলে বাংলাদেশের লাভ কোথায়?
সবচেয়ে বড় সুবিধা কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা ও ‘কনভেনিং পাওয়ার’। এক বছর ধরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সভাপতির কার্যালয়। বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক সেই অবস্থানে থাকায় দেশটির বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক পরিচিতি ও নেটওয়ার্ক বিস্তারের সুযোগ বাড়বে। তবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট নীতিগত সুবিধার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খলিলুর রহমান তার সভাপতিত্বের ছয়টি অগ্রাধিকারের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার এবং জাতিসংঘ সংস্কারের মতো বিষয় রেখেছেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেছেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ফল এবং সংস্কার দুটোই প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে শান্তিরক্ষা, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মতো বিষয়গুলো। এসব ইস্যু বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে মেলে। কিন্তু সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানকে এগুলো কেবল বাংলাদেশের স্বার্থ হিসেবে নয়, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর স্বার্থের কাঠামোয় তুলতে হবে।
৮১তম অধিবেশনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হবে ৩১ ডিসেম্বর। প্রার্থী যাচাইয়ের বেশির ভাগ প্রকাশ্য সংলাপ আগের সভাপতি আনালেনা বায়ারবকের সময়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ৮ সেপ্টেম্বর তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার দায়িত্ব খলিলুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন।
এখন নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে এবং জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাধারণ পরিষদ সেই সুপারিশের ভিত্তিতে মহাসচিব নিয়োগ করবে। অর্থাৎ খলিলুর রহমান প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখতে ভূমিকা রাখতে পারবেন, কিন্তু কে মহাসচিব হবেন, তা এককভাবে নির্ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই।
তাই খলিলুর রহমানের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সুবিধার ‘চাবি’ নয়। বরং এটি এক বছরের একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ, যেখানে বাংলাদেশের একজন নাগরিক আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রীয় মঞ্চ পরিচালনা করবেন।
এই সুযোগ থেকে বাংলাদেশ কতটা দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক মূলধন তৈরি করতে পারবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই অর্জনের বাস্তব মূল্য নির্ধারণ করবে।
নবোদয়/ এসএন/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬