Loading...

বাংলাদেশের চালচিত্র
খেলাধুলার কথাই ধরা যাক। ২০২৬ সালের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস এখনো চলমান। ২৯ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ পদকতালিকায় বাংলাদেশের নাম ৩৬তম স্থানে, একটি ব্রোঞ্জ নিয়ে। একই তালিকায় চীনের পদক ২৩০টি, জাপানের ১৭৭টি।


প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। সম্ভাবনার কথা বলতে আমরা ক্লান্ত হই না। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান, উদ্যোক্তা ও শ্রমশক্তি, সবকিছু মিলিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই।
কিন্তু দেশের বাস্তব অগ্রগতির ছবিটা যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচক, প্রতিযোগিতা ও অর্জনের তালিকায় দেখা যায়, তখন সেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার একটা অস্বস্তিকর দূরত্ব চোখে পড়ে।
খেলাধুলার কথাই ধরা যাক। ২০২৬ সালের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস এখনো চলমান। ২৯ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ পদকতালিকায় বাংলাদেশের নাম ৩৬তম স্থানে, একটি ব্রোঞ্জ নিয়ে। একই তালিকায় চীনের পদক ২৩০টি, জাপানের ১৭৭টি।
বাংলাদেশের অর্জন বাড়তে পারে। আসর শেষও হয়নি। কিন্তু প্রশ্নটা একটি এশিয়ান গেমসের পদক নিয়ে নয়। দীর্ঘ সময়ের ছবিটা কী বলছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৪ সাল থেকে প্রতিটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এখনো কোনো পদক আসেনি। ২০১০ সালের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ একটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ জিতেছিল। সেটিই এখনো এশিয়ান গেমসে আমাদের অন্যতম সেরা অর্জন। ২০২৩ সালের আসরে এসেছিল দুটি ব্রোঞ্জ।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশ থেকে বিশ্বমানের কয়েকজন ক্রীড়াবিদ তৈরি করা কি এতটাই কঠিন?
আসলে জনসংখ্যা নিজে কোনো সম্পদ নয়, যদি সেই মানুষকে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা না থাকে। তরুণ জনগোষ্ঠী কেবল সম্ভাবনার কাঁচামাল। পদক তৈরি করে ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। নিয়মিত স্কুল ক্রীড়া, প্রতিভা বাছাই, দক্ষ কোচ, পুষ্টি, স্পোর্টস সায়েন্স, অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক ফেডারেশন, পুরো ব্যবস্থাটিই প্রয়োজন।
কিন্তু খেলাধুলার বাইরে তাকালেও খুব স্বস্তির ছবি পাওয়া যায় না।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ১ হাজার ৫৭৭ কোটি ৩০ লাখ এবং পরিচালন খাতে ১ হাজার ৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
অঙ্কটি শুনতে বড়। কিন্তু এর মধ্যে যুব উন্নয়নও রয়েছে। ফলে শুধু খেলাধুলায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ কতটা, সেই প্রশ্ন আলাদা। আর বড় বাজেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
এবার অন্য কয়েকটি তালিকায় চোখ দেওয়া যাক। বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের আইকিউএয়ার প্রতিবেদনে ১৪৩ দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত। বার্ষিক গড় পিএম ২.৫-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৬ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম।

দুর্নীতির ধারণা সূচকেও ছবিটি উজ্জ্বল নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২৪, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৪২।
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার ২০২৫ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। WIPO
অর্থাৎ একদিকে দূষণ, অন্যদিকে দুর্নীতির ধারণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতার মতো সূচকে আমাদের বড় ঘাটতি। খেলাধুলায়ও আন্তর্জাতিক সাফল্য সীমিত।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অবৈধ আর্থিক প্রবাহের পরিমাণ বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। পুরো সময়ের হিসাব প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। তবে এটি বিভিন্ন অনুমান ও পদ্ধতির ভিত্তিতে করা একটি প্রাক্কলন, সরাসরি হিসাব করা অর্থের পরিমাণ নয়।
অঙ্কটি তাই শুধু অর্থনীতির হিসাব নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কারণ যে অর্থ দেশের ভেতরে বিনিয়োগ, শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো কিংবা দক্ষতা তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, তার একটি অংশ যদি অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। দায় কি শুধু সরকারের?
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তার দায় অবশ্যই সরকারের। কিন্তু রাষ্ট্র তো আকাশ থেকে তৈরি হয় না। আমরাই প্রতিষ্ঠান তৈরি করি, আমরাই সেগুলো চালাই, আবার অনেক সময় আমরাই নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলি।
লাইনে না দাঁড়ানো, ঘুষ দিয়ে কাজ দ্রুত করানো, কর ফাঁকি দেওয়া, রাস্তা নোংরা করা, পরিচয়ের জোরে সুবিধা নেওয়া, যোগ্যতার বদলে পরিচিতি খোঁজা, অন্যায় দেখেও চুপ থাকা, এগুলোও একটি সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।
আমরা দেশপ্রেমকে পতাকা, স্লোগান আর আবেগের মধ্যে আটকে রাখি। অথচ দেশপ্রেমের কঠিন অংশটা অনেক বেশি সহজ।
নিয়ম মানা। যোগ্য মানুষকে সুযোগ দেওয়া। জনগণের অর্থের হিসাব চাওয়া। নিজের দলের মানুষ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো। প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে রাখা।
সমস্যাটা এখানেই। আমরা বড় হতে চাই, কিন্তু বড় হওয়ার জন্য যে প্রতিষ্ঠান, শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার, সেগুলো তৈরি করতে চাই না। আমরা ফলাফল চাই, কিন্তু ফল তৈরির প্রক্রিয়াটাকে গুরুত্ব দিতে চাই না।
একটি দেশ শুধু বড় জনসংখ্যা দিয়ে শক্তিশালী হয় না। শুধু বড় বাজেট দিয়েও নয়। শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা, জাতীয়তাবাদী স্লোগান কিংবা সম্ভাবনার গল্প দিয়েও নয়।
শক্তিশালী দেশ তৈরি হয় এমন প্রতিষ্ঠান দিয়ে, যেখানে প্রতিভা সুযোগ পায়, রাষ্ট্রীয় অর্থের হিসাব থাকে, গবেষণা মূল্য পায়, নিয়ম সবার জন্য একই থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকার বদলালেও টিকে থাকে।
বাংলাদেশের সমস্যা তাই সম্ভাবনার অভাব নয়। বরং সম্ভাবনাকে ফলাফলে রূপ দেওয়ার ব্যবস্থার দুর্বলতায়।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬