Loading...

বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু আজকের গরু বা ছাগলের সঙ্গে শুরু হয়ে আজই শেষ হয়ে যায় না। মাটিতে থাকা স্পোর বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে। সেই মাটি থেকে পশু আক্রান্ত হয়, আক্রান্ত পশু থেকে মানুষ, আর অসুস্থ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে বহু মানুষের শরীরে জীবাণু পৌঁছাতে পারে।


অ্যানথ্রাক্স নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস কাটাকাটি ও বণ্টনের পর কয়েক ডজন মানুষের মধ্যে সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
একই সময়ে মেহেরপুরের গাংনীতে বছরের শুরু থেকে শত শত মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। সেখানে শুধু গরু নয়, ছাগলের মাংসের সংস্পর্শও সংক্রমণের বড় উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে এবারের পরিস্থিতি শুধু ‘অসুস্থ গরুর মাংস খাওয়া’র ঘটনা নয়; গবাদিপশুর রোগ শনাক্তকরণ, টিকাদান, জবাই-পদ্ধতি এবং মানুষের আচরণের সঙ্গে পুরো সংক্রমণচক্রটি জড়িয়ে আছে।
অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা Bacillus anthracis নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। মাটিতে এই ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘদিন স্পোর হিসেবে টিকে থাকতে পারে। গরু, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী দূষিত মাটি, ঘাস বা পানি থেকে সেই স্পোর গ্রহণ করলে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত প্রাণী অনেক সময় দৃশ্যমান অসুস্থতার লক্ষণ দেখানোর আগেই মারা যেতে পারে। মৃত পশুর দেহ খোলা হলে অক্সিজেনের সংস্পর্শে ব্যাকটেরিয়া স্পোর তৈরি করে পরিবেশকে দীর্ঘমেয়াদে দূষিত করতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ সবচেয়ে আলোচিত নতুন ক্লাস্টারগুলোর একটি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে অসুস্থ একটি গরু জবাই করার পর মাংস কাটাকাটিতে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। পরে সেই মাংস প্রায় ১০০ ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৭ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ২৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১-এ ওঠার কথা জানানো হয়।
ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে শুধু মাংস খাওয়া মানুষ নয়, মাংস কাটা ও পশু জবাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরাও আক্রান্ত হয়েছেন। একটি পরীক্ষায় অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনায় অ্যানথ্রাক্স জীবাণু শনাক্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে আইইডিসিআরও পরিস্থিতি তদন্তে মাঠে গেছে। গত বছরও রংপুর অঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল।
অন্যদিকে মেহেরপুরের গাংনীতে অ্যানথ্রাক্স আরও পুরোনো এবং পুনরাবৃত্ত সমস্যা। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সেখানে ৭৯৩ জন, ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৬৩৭ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চলতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১২ থেকে ৪৬২ জনের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাংনীর এবারের তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাগলের মাংসের ভূমিকা। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪১২ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জানিয়েছে, ২৬২ জন বা প্রায় ৬২ শতাংশ ছাগলের মাংসের সংস্পর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরও ১৩০ জনের ক্ষেত্রে গরুর মাংসের সংস্পর্শের কথা পাওয়া গেছে এবং ২০ জনের সংক্রমণের উৎস নির্দিষ্ট করা যায়নি। অর্থাৎ অ্যানথ্রাক্সের আলোচনায় শুধু গরুকে দায়ী করলে গাংনীর বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মানুষের শরীরে অ্যানথ্রাক্স সাধারণত তিনভাবে দেখা যায়—ত্বকের মাধ্যমে, আক্রান্ত মাংস খাওয়ার মাধ্যমে এবং বিরল ক্ষেত্রে জীবাণুর স্পোর শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢোকার মাধ্যমে। বাংলাদেশে আলোচিত ঘটনাগুলোর বড় অংশ ত্বক-সংক্রান্ত। আক্রান্ত পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটা বা পরিষ্কার করার সময় হাতে থাকা ছোট ক্ষত দিয়েও জীবাণু শরীরে ঢুকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মানুষের অ্যানথ্রাক্সের ৯৫ শতাংশের বেশি ত্বকীয় ধরনের।
অ্যানথ্রাক্স সাধারণ ফ্লু বা কোভিডের মতো মানুষ থেকে মানুষে সহজে ছড়ায় না। সংক্রমণের প্রধান পথ হলো আক্রান্ত প্রাণী, তার রক্ত-মাংস-চামড়া বা দূষিত প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শ। তাই আক্রান্ত মানুষকে ঘিরে আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে তার সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাণীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও কঠিন। অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত গরু বা ছাগল দ্রুত মারা যেতে পারে এবং মৃত্যুর আগে সুস্পষ্ট লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। জ্বর, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, কাঁপুনি এবং শরীরের বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে জমাট না বাঁধা রক্ত বের হওয়া সতর্কসংকেত হতে পারে। কিন্তু সন্দেহ হলেই পশুটি জবাই করে মাংস বিক্রি বা ভাগ করে দেওয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর একটি। বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অ্যানথ্রাক্সে মৃত পশুর দেহ খোলা উচিত নয়; সঠিকভাবে নিষ্পত্তি, আক্রান্ত স্থান নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের সংবেদনশীল পশুকে টিকাদান জরুরি।
বাংলাদেশে প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হলো পশুর টিকা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যেও গরু ও ছাগলের জন্য অ্যানথ্রাক্স বা তড়কার টিকার কথা রয়েছে। গাংনীতে চলতি বছর ৫০ হাজার গরু-ছাগলকে টিকা দেওয়ার কর্মসূচির কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু একই এলাকায় বছরের পর বছর মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, শুধু একবারের টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি দূর করা কঠিন।
২০২৬ সালের একটি বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণাও সমস্যাটির গভীর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। গবেষণায় গবাদিপশুর অ্যানথ্রাক্সের সঙ্গে সামষ্টিকভাবে পশু চরানো, অসুস্থতার সময় বিশেষ ধরনের তাজা ঘাস খাওয়ানো, টিকা না দেওয়া এবং খামারে পশু জবাইয়ের মতো ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মাটির ওপরের স্তর সরানো বা দূষিত মাটি খামারে ব্যবহারের সঙ্গেও ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটি দেখায়, অ্যানথ্রাক্সকে শুধু ‘একটি অসুস্থ গরু’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো সমস্যাটি বোঝা যায় না; এর সঙ্গে মাটি, পশুপালন, টিকাদান ও জবাই ব্যবস্থাও যুক্ত।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অসুস্থ গরু বা ছাগলকে দ্রুত জবাই করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রবণতাই অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। কোনো পশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে সেটির মাংস খাওয়া, বিক্রি বা বিতরণ না করে দ্রুত স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানানো জরুরি। আর যেসব এলাকায় আগে অ্যানথ্রাক্স হয়েছে, সেখানে টিকাদানকে মৌসুমি কর্মসূচি হিসেবে নয়, নিয়মিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
কারণ অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু আজকের গরু বা ছাগলের সঙ্গে শুরু হয়ে আজই শেষ হয়ে যায় না। মাটিতে থাকা স্পোর বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে। সেই মাটি থেকে পশু আক্রান্ত হয়, আক্রান্ত পশু থেকে মানুষ, আর অসুস্থ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে বহু মানুষের শরীরে জীবাণু পৌঁছাতে পারে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬