Loading...

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হামলা: দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত ২৭
বার, খেলার মাঠ, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনসমাগমের পরিচিত জায়গাগুলোতে সশস্ত্র হামলা বারবার ফিরছে বিশ্বসংবাদে। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে: মানুষ কেন এমন হত্যাকাণ্ড ঘটায়, আর রাষ্ট্র কেন তা ঠেকাতে পারে না? দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হামলা সেই প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে।


বার, খেলার মাঠ, বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনসমাগমের পরিচিত জায়গাগুলোতে সশস্ত্র হামলা বারবার ফিরছে বিশ্বসংবাদে। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে: মানুষ কেন এমন হত্যাকাণ্ড ঘটায়, আর রাষ্ট্র কেন তা ঠেকাতে পারে না? দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হামলা সেই প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। কিন্তু চলতি বছরের ঘটনাগুলোতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সব হামলার উদ্দেশ্য এক নয়। ভয়াবহ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলেই বিশ্বজুড়ে অপরাধ বাড়ছে—এ সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে জোহানেসবার্গের দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়েদেলার একটি বারে আট বন্দুকধারী প্রথমে বাইরে থাকা লোকজনকে গুলি করে, পরে ভেতরে ঢোকে। নিহত হন ১৭ জন, আহত ১৫ জন।
এ বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় এমন হামলা আগেও ঘটেছে। ২২ সেপ্টেম্বর ডারবানের কাছে কোয়ামাখুথার একটি বাড়িতে বন্দুকধারীদের গুলিতে ১১ জন নিহত হন। পুলিশ বলেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর বিরোধের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না; তবে কারণ নিশ্চিত হয়নি। জুনে জোহানেসবার্গের ক্লিভল্যান্ড এলাকায় বন্দুকধারীদের হামলায় ১২ জন নিহত হন। সেখানেও পুলিশ উদ্দেশ্য জানাতে পারেনি। ফলে ঘটনাগুলো একই চক্রের কাজ—এমন দাবি করার প্রমাণ নেই।
এছাড়া আরও কয়েকটি দেশে চলতি বছরের কয়েকটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট করে। ২৫ জানুয়ারি মেক্সিকোর সালামানকায় ফুটবল মাঠে গুলিতে ১১ জন নিহত হন। রাজ্য সরকার পরে সন্দেহভাজন অপরাধী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের কথা জানায়। তাদের দায় আদালতে প্রমাণের বিষয়।
১০ ফেব্রুয়ারি কানাডার টাম্বলার রিজে একটি বাড়ি ও বিদ্যালয়ে গুলিতে আটজন নিহত হন; হামলাকারীও মারা যান। কানাডার পুলিশ জুলাইয়েও তদন্ত চলার কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহোতে ১ আগস্ট একটি রেস্তোরাঁ ও আশপাশে গুলিতে তিনজন নিহত হন। সেখানকার পুলিশও হামলার উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।

আবার নাইজেরিয়ার কোয়ারা রাজ্যের ওরো ও নুকু গ্রামে ৩ ফেব্রুয়ারির সশস্ত্র হামলায় স্থানীয় এক আইনপ্রণেতার হিসাবে অন্তত ১৬২ জন নিহত হন। সরকার হামলাকারীদের উগ্রপন্থি বলেছে, যদিও নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর দায় নিশ্চিত হয়নি। আক্রান্ত গ্রামগুলোর বহু বাসিন্দাই মুসলিম ছিলেন।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ফেব্রুয়ারিতে শিয়া উপাসনালয়ে আত্মঘাতী হামলার দায় আইএস দাবি করেছিল। সেটি বিস্ফোরক ব্যবহার করা সন্ত্রাসী হামলা; দক্ষিণ আফ্রিকার বারে গুলি চালানোর উদ্দেশ্যও একই ছিল, এমন প্রমাণ নেই। ধর্মের নামে সহিংসতা চালানো গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা আর কোনো ধর্মের অনুসারীদের একত্রে দায়ী করা এক কথা নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার পুরোনো ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে অপরাধতত্ত্ববিদ গাই ল্যাম্ব এলাকা ও অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, পরিবহন রুটের বিরোধ, অবৈধ খনি এবং প্রতিশোধের চক্রের কথা বলেছেন। তবে ওই গবেষণা দিয়ে ওয়েদেলা বা লোয়ান্ডলের হামলার কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নও এড়ানো যায় না। সংগঠিত অপরাধ ও অবৈধ খনি মোকাবিলায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এ বছর পুলিশকে সহায়তা করতে সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দেন। গবেষক ক্রিগলার ও ল্যাঙ্কাস্টারের সতর্কতা হলো, এমন অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; দীর্ঘস্থায়ী ফলের জন্য অপরাধী চক্র শনাক্ত, তদন্ত ও স্থানীয় পুলিশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইভাবে নাইজেরিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা পৌঁছানোর প্রশ্নটি শহরের একটি বারে হামলা ঠেকানোর প্রশ্ন থেকে আলাদা। রাষ্ট্রের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো নির্দিষ্ট হামলার উদ্দেশ্যের বিকল্প প্রমাণ নয়।
মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাতেও সতর্কতা জরুরি। মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের গবেষণায় ২০১৬–২০ সালের ১৭৩টি প্রকাশ্য স্থানে গণহামলার প্রায় অর্ধেকের পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা কর্মক্ষেত্রের ক্ষোভ পাওয়া গেছে। এক-চতুর্থাংশ হামলাকারীর মধ্যে বিদ্বেষমূলক মতাদর্শ বা ষড়যন্ত্রবিশ্বাস ছিল। অনেকের মানসিক সংকটের লক্ষণও দেখা যায়। কিন্তু লক্ষণ থাকা মানেই মানসিক অসুস্থতা হামলার একমাত্র কারণ নয়। মনোবিজ্ঞানী জিলিয়ান পিটারসন সংকটের সংকেত চিহ্নিত করা, সহায়তা পৌঁছানো এবং সংকটের সময় আগ্নেয়াস্ত্রে প্রবেশ সীমিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মার্কিন গবেষণার এই ফল বিশ্বের সব হামলাকারীর ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না।

ধর্মীয় উগ্রবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ বা চরম জাতীয়তাবাদ কিছু হামলার চালিকা শক্তি হতে পারে। কিন্তু উগ্রপন্থি সংগঠনে যোগ দেওয়ার কারণও শুধু মতাদর্শ নয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আফ্রিকার আট দেশে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণায় স্বেচ্ছায় যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের এক-চতুর্থাংশ চাকরির সুযোগকে প্রধান কারণ বলেছেন; ধর্মীয় কারণ ছিল তৃতীয় স্থানে। যারা যোগ দেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মোড় ঘোরানো কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বের আইনশৃঙ্খলা কি অবনতির পথে? সূচকভেদে উত্তর বদলায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় এপ্রিল–জুনে হত্যাকাণ্ড আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, যদিও ওই তিন মাসেই নিহত ৫ হাজার ৪২৭ জন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ড কমেছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ; ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নমুনাভুক্ত ৩০টি শহরেও আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বলছে, ২০২৫ সালে সশস্ত্র সংঘাতে মৃত্যু অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে ছিল। একই বছরে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদে মৃত্যু ২৮ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স। যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও সাধারণ অপরাধ এক হিসাবে ধরলে প্রবণতা বোঝা যায় না।
ওয়েদেলা ও লোয়ান্ডলে কারা কাকে লক্ষ্য করেছে, দুই হামলার কোনো সংযোগ আছে কি না, অস্ত্র কোথা থেকে এসেছে—এসব এখনো তদন্তের প্রশ্ন। বিদ্যমান গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে প্রতিরোধের পথ হিসেবে এসেছে অবৈধ অস্ত্র শনাক্ত করা, প্রতিশোধের হুমকি আগেভাগে খতিয়ে দেখা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর তদন্ত এবং সহিংসতার সংকেতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো। আজকের দুই হামলার আসল কারণ বলতে হলে আগে সেই তদন্তের প্রমাণ লাগবে।
নবোদয়/ এসএন/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬