Loading...

সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অবস্থান কোথায়
পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় প্রবেশানুমতি ও বিমান টিকিট ছিল। কিন্তু তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর অভিযোগ, নেপাল ভ্রমণে যাওয়ার পথে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—পরিবার জানে কি না, অবিবাহিত অবস্থায় নিজেরা কেন যাচ্ছেন। পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরও তাদের যাত্রা আটকে যায়।


পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় প্রবেশানুমতি ও বিমান টিকিট ছিল। কিন্তু তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর অভিযোগ, নেপাল ভ্রমণে যাওয়ার পথে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—পরিবার জানে কি না, অবিবাহিত অবস্থায় নিজেরা কেন যাচ্ছেন। পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরও তাদের যাত্রা আটকে যায়। এই অভিযোগ এখন হাইকোর্টে। প্রশ্নটি শুধু তিনজনের ভ্রমণ নিয়ে নয়; একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার সময় কতটা স্বীকৃতি পাচ্ছে, তা নিয়েও।
আবেদনকারীদের আইনজীবী ইশরাত হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের আটকানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল না। যাত্রা বন্ধ হওয়ায় টিকিট ও অন্যান্য বুকিংয়ের অর্থও হারান তারা। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে রিট করেন।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চ জানতে চান, বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক কারণে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বৈধ যাত্রায় বাধা ঠেকাতে নির্দেশনা জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা-ও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
আইনজীবী জানান, আবেদনকারীদের অভিযোগ সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ কাগজপত্র থাকলে তাদের পরবর্তী বিদেশযাত্রায় বাধা না দিতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে বাধা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত রায় হয়নি।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদ অনুয়ায়ী নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। ৩৬ অনুচ্ছেদে জনস্বার্থে আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে দেশ ত্যাগ ও ফিরে আসার অধিকার স্বীকৃত। পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩-এ পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। অবিবাহিত নারীর পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যানের কোনো বিধান নেই। ফলে পারিবারিক অনুমোদনকে ভ্রমণের শর্ত বানানোর আইনগত ভিত্তিই এখানে প্রশ্নের মুখে।
ভ্রমণকন্যা–ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা সাকিয়া হক এ ঘটনা নিয়ে এক কলামে প্রশ্ন করেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ভ্রমণ কেন বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে? তার ভাষ্যে, নারী যাত্রীদের স্বামী একা যেতে দিয়েছেন কি না কিংবা ভ্রমণের টাকা কোথায় পেয়েছেন—এমন প্রশ্নও করা হয়। তিনি ও মানসী সাহা একসময় ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রশিক্ষণে লিঙ্গসমতা নিয়ে কাজ করেছিলেন। পেশাদার ও বৈষম্যহীন সেবা নিশ্চিত করার দাবি করেন তিনি।
আরেক ভ্রমণকারী শামীমা আখতার বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে অভিজ্ঞতা লিখেছেন। ২০১৭ সালে দলগত সাইকেল ভ্রমণে ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, একজন নারী কেন বিদেশে সাইকেল চালাবেন। একা ভ্রমণের সময় পরিবার কে দেখাশোনা করেন, সে প্রশ্নও শুনেছেন তিনি। তিনি বলেন, ভ্রমণের উদ্দেশ্য যাচাইয়ের সঙ্গে নারীর পারিবারিক ভূমিকা নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশাও মিশে যাচ্ছে।
নারীর প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ঘটনা বিমানবন্দরের বাইরেও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে নারীদের ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের বিরোধিতা করে মাঠের টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়; পরদিনের ম্যাচ বাতিল হয়। পরে জড়িতরা ক্ষমা চান এবং নারীদের খেলায় বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার সৈকতে কয়েকজন নারীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় পুলিশ একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

এসব ঘটনার আলোচনায় নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা—দুটি বিষয়ই জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জরিপে দেশীয় প্রেক্ষাপটসহ সহিংসতার সংজ্ঞায় দেখা যায়, কখনো বিবাহিত হয়েছেন এমন ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ৭৬ শতাংশ জীবনে অন্তত এক ধরনের স্বামীর সহিংসতার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও রয়েছে। এই পরিসংখ্যান সব নারীর বিদেশভ্রমণের ঝুঁকি মাপে না; তবে ঘর ও সম্পর্কের মধ্যেও নিরাপত্তার সংকট যে গভীর, তা তুলে ধরে।
নারী অধিকারকর্মীদের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও স্বাধীনতার প্রশ্নটি এসেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর মহিলা পরিষদের এক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, সমাজ এখনো নারীকে স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর আগে ১৬ আগস্ট সহিংসতাবিরোধী মানববন্ধনে সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেছিলেন, ‘নারীদের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো যাবে না।’ তিনি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
ইমিগ্রেশনে নিরাপত্তা ও নথি যাচাই প্রয়োজন। সেই যাচাইয়ের ভিত্তি হতে হবে আইনসম্মত কারণ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন বা পরিবারের অনুমতি নিয়েছেন কি না—এসবের মধ্যে কোনটি বৈধ যাত্রা আটকে দেওয়ার কারণ, কর্তৃপক্ষকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। তিন নারীর রিট সেই জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করেছে। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্তের আরেকটি বাধা হয়ে উঠছে কি না, সেটিও এখন বিচারিক পরীক্ষার বিষয়।
নবোদয়/ এসএন/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬