Loading...

প্রাণিখাদ্যের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা
ব্রাজিলের দখলে ৬৮ শতাংশ, ভারতের সরবরাহ কমছে; ৮ বছর পর ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র—বাড়ছে ভুট্টার আমদানিনির্ভরতা।


বাংলাদেশের ভুট্টার বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। একসময় প্রতিবেশী ভারত ছিল দেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। কিন্তু ভারতের রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত কমে যাওয়ার পর ব্রাজিল দ্রুত বাজার দখল করেছে। এবার প্রায় আট বছর পর যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের বাজারে ফিরে এসে উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়েছে। ফলে দেশের ভুট্টা আমদানির সরবরাহব্যবস্থা এখন ভারতকেন্দ্রিক না থেকে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সরে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (USDA) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশ ১৭ লাখ ৪০ হাজার টনের বেশি ভুট্টা আমদানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ এসেছে ব্রাজিল থেকে, ২৪ শতাংশ ভারত থেকে এবং প্রায় ৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা বাংলাদেশের বাজারে ফিরেছে আট বছর পর। প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার টন মার্কিন ভুট্টা বাংলাদেশে এসেছে এই বিপণন বছরে।
কিন্তু কয়েক বছর আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪–২৫ বিপণন বছরে বাংলাদেশের আমদানি করা ভুট্টার প্রায় ৯৩ শতাংশই এসেছিল ব্রাজিল থেকে নয়, বরং ব্রাজিলের আধিপত্য তখনও এতটা ছিল না—ভারত ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। ভারতের ভুট্টা বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক ছিল মূলত কম পরিবহন ব্যয়, সীমান্তঘেঁষা সরবরাহব্যবস্থা এবং দ্রুত আমদানির কারণে।
২০২৪ সালের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ভুট্টাভিত্তিক জৈব জ্বালানি উৎপাদন বাড়ায় দেশটির রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত কমতে থাকে। ফলে বাংলাদেশ বিকল্প উৎসের দিকে যেতে শুরু করে।
সেই জায়গা দ্রুত নিয়েছে ব্রাজিল। ২০২৫–২৬ বিপণন বছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের প্রায় ১৫ লাখ টন ভুট্টা আমদানির ৭৮ শতাংশই এসেছিল ব্রাজিল থেকে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত প্রত্যেকে প্রায় ১১ শতাংশ করে সরবরাহ করেছিল।
তবে কেন হঠাৎ এত ভুট্টা লাগছে বাংলাদেশে?
এর উত্তর রয়েছে দেশের পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্যশিল্পে। ভুট্টা এসব প্রাণিখাদ্যের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। USDA-এর হিসাবে, ২০২৫–২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশে খাদ্য ও অন্যান্য ব্যবহারে ভুট্টার চাহিদা প্রায় ৬৯ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। দেশে প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ফিড কোম্পানি বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন বাণিজ্যিক খাদ্য উৎপাদন করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশই পোলট্রি খাদ্য।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ভুট্টার বাজারের গল্পটি আসলে শুধু কৃষিপণ্যের বাজারের গল্প নয়। এটি মুরগি, ডিম, মাছ ও গরুর খাদ্যের বাজারের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ভুট্টার আন্তর্জাতিক দাম বা সরবরাহে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব ফিডের উৎপাদন খরচে পড়তে পারে। আর ফিডের খরচ বাড়লে পোলট্রি ও মাছের উৎপাদন খরচও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে দেশে ভুট্টার উৎপাদনও বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ভুট্টা উৎপাদন প্রায় ৫১ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। USDA-এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে ২০২৬–২৭ বিপণন বছরে উৎপাদন আরও বেশি হয়ে প্রায় ৬০ লাখ টনে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে।
তারপরও আমদানি কেন প্রয়োজন? কারণ উৎপাদন বাড়লেও খাদ্যশিল্পের চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ছে। USDA ২০২৬–২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশে ভুট্টার আমদানি প্রায় ১৮ লাখ টন হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থাৎ দেশে উৎপাদন বাড়লেও আমদানির প্রয়োজন পুরোপুরি কমছে না।
এখানেই বদলে যাওয়া সরবরাহ মানচিত্রের গুরুত্ব। ভারত কাছের বাজার হওয়ায় পরিবহন সুবিধা রয়েছে। ব্রাজিল দীর্ঘ দূরত্বের সরবরাহকারী হলেও বড় পরিমাণে প্রতিযোগিতামূলক দামে ভুট্টা দিতে পারছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা বাংলাদেশের আমদানিকারকদের হাতে আরেকটি বড় উৎস তৈরি করছে।
এতে একটি সুবিধা হলো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমতে পারে। কোনো সরবরাহকারী দেশে উৎপাদন কমে গেলে, রপ্তানি নীতি বদলালে কিংবা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে গেলে বাংলাদেশ অন্য উৎস থেকে আমদানি করতে পারবে। তবে দূরবর্তী উৎস থেকে আমদানি বাড়লে পরিবহন ও জাহাজভাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারও আরও বেশি যুক্ত হবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি তাই সরবরাহকারীর তালিকায় নয়, বাংলাদেশের খাদ্য অর্থনীতিতে। দেশে ভুট্টার উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে শিল্পে এর ব্যবহার। ফলে বাংলাদেশের ভুট্টার বাজার এখন আর শুধু কৃষকের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজভাড়া, ফিড শিল্প এবং ব্রাজিল-যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সরবরাহনীতিও এর দাম ও প্রাপ্যতা নির্ধারণ করছে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬