Loading...

অকাল মৃত্যুর নেপথ্যে যে পাঁচ কারণ
বাংলাদেশে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কর্মস্থল, বাসা কিংবা চলার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কম বয়সী মানুষের মৃত্যুর খবর প্রায়ই সামনে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও কিডনি রোগসহ অসংক্রামক ব্যাধিতে বাংলাদেশে প্রায় ৭১ শতাংশ মৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই অকাল মৃত্যু।


দুপুরে অফিসে কাজ করার সময় শরীর খারাপ হয়েছিল এক্স ইনডেক্সের কর্মকর্তা জুয়েল হাকিমের। ঘাড় ও হাত-পায়ে ব্যথা, বমিভাব এবং মাথা ঝিমঝিম করলেও বিষয়টিকে তিনি গুরুতর মনে করেননি। রাতে অসুস্থতা বাড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, দুপুরেই তাঁর স্ট্রোক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে মারা যান ৪২ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কর্মস্থল, বাসা কিংবা চলার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কম বয়সী মানুষের মৃত্যুর খবর প্রায়ই সামনে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও কিডনি রোগসহ অসংক্রামক ব্যাধিতে বাংলাদেশে প্রায় ৭১ শতাংশ মৃত্যু ঘটে। এসব মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই অকাল মৃত্যু।
তবে ‘আকস্মিক মৃত্যু’ ও ‘অকাল মৃত্যু’ এক বিষয় নয়। সাধারণত ৭০ বছর বয়সের আগে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুকে অকাল মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে আকস্মিক মৃত্যু ঘটে খুব অল্প সময়ের মধ্যে। অনেক অসংক্রামক রোগ দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে থাকলেও হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো জরুরি জটিলতার মাধ্যমে হঠাৎ প্রকাশ পেতে পারে।
প্রধান ঝুঁকিগুলোর একটি হৃদরোগ। হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে হার্টের পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছায় না এবং হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমিভাব এবং পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া এর পরিচিত লক্ষণ। তবে সবার ক্ষেত্রে তীব্র বুকব্যথা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে নারী ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে।

স্ট্রোক হৃদযন্ত্রে নয়, আঘাত হানে মস্তিষ্কে। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া কিংবা রক্তনালি ফেটে গেলে এটি ঘটে। মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত দুর্বল বা অবশ হওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া—এই তিন লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর কমে গেলেও সেটিকে অবহেলা করা নিরাপদ নয়।
তৃতীয় বড় ঝুঁকি ডায়াবেটিস। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছাতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এবং রক্তনালির জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগও অকাল মৃত্যুর বড় কারণ। হাঁপানি ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির পেছনে ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং রান্নার ধোঁয়ার বড় ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট কিংবা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠাকে সাধারণ সমস্যা মনে করে এড়িয়ে গেলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।
পঞ্চম বড় ঝুঁকি ক্যানসার। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার গ্লোবোক্যানের ২০২২ সালের হিসাবে, বাংলাদেশে এক বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ মানুষের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি। একই সঙ্গে বিপৎসংকেত দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দেরিই অনেক সময় জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬