Loading...

সাড়ে তিন মাসে প্রায় আড়াই লাখ কেজি সার জব্দ, আটক ১২৭
চলতি বছরের জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড। এ সময় সার পাচারের অভিযোগে ১২৭ জনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে।


কক্সবাজারে চাহিদার তুলনায় বেশি সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। তারপরও জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভর্তুকির সারের একটি অংশ সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আর এই চোরাচালানে জড়িতদের অনেকেই ইয়াবা, আইস, অস্ত্র ও মানবপাচার চক্রের সদস্য।
চলতি বছরের জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড। এ সময় সার পাচারের অভিযোগে ১২৭ জনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক ও বহনকারী। পাচারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরকারি হিসাবে, সেপ্টেম্বরে কক্সবাজারে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ১ হাজার ৮৪৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। চাহিদার চেয়ে ৫০০ মেট্রিক টন বেশি। ডিএপির চাহিদা ৭৮৯ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৮৮৯ মেট্রিক টন। টিএসপির চাহিদা ও বরাদ্দ উভয়ই ৪৭৫ মেট্রিক টন। তারপরও উখিয়া ও টেকনাফের কৃষকদের একাংশ সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
টেকনাফের কয়েকজন কৃষক বলেন, প্রয়োজনীয় সার পেতে তিনি ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। অথচ তাঁর ও পাশের ইউনিয়নের বিভিন্ন পথ দিয়ে প্রায় প্রতিদিন সারসহ বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। টেকনাফ সদরের কৃষক আব্দুল লতিফের অভিযোগ, ডিলাররা কৃষক নন—এমন ব্যক্তিদের কাছেও সার বিক্রি করছেন। পরে এসব সার মজুত করে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
কোস্টগার্ড জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে ৩ হাজার ২৫২ বস্তা বা ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ কেজি সার জব্দ করেছে। এসব অভিযানে ৮২ জনকে আটক করে নয়টি মামলা করা হয়। একই সময়ে বিজিবির বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ৭৩ হাজার ৩০৮ কেজি সার জব্দ করেছে। উখিয়া ও টেকনাফ থেকে আটক করা হয়েছে আরও ৪৫ জনকে।

পাচারকারীরা স্থলপথে নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় এখন জলপথ বেশি ব্যবহার করছে। নৌকার মাঝি, সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা, কৃষক ও ভাড়ায় নেওয়া শ্রমিকদের দিয়ে সার সীমান্ত পার করা হচ্ছে। টেকনাফ, উখিয়া, সেন্টমার্টিন ও কুতুবিয়ার উপকূলের পাশাপাশি নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু ও ঘুমধুম সীমান্তকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
সার পাচারের প্রধান কারণ হিসেবে দুই দেশের বাজারমূল্যের বড় ব্যবধানকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক বস্তা ইউরিয়া মিয়ানমারে প্রায় ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। এই বিপুল লাভের আশায় মাদক ও মানবপাচারে জড়িত চক্রগুলোও সার পাচারে অর্থ বিনিয়োগ করছে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীর দাবি, সার পাচারে জড়িত চক্রই ইয়াবা ও আইসসহ মাদক পাচার করছে। মিয়ানমার থেকে সরাসরি টাকা বা ডলার আনার সুযোগ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এই চোরাচালান চলছে। তবে সার দিয়ে ইয়াবা আনার সুনির্দিষ্ট কোনো চালান জব্দের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেখানে জান্তা সরকার সার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ওই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ লাখ একর জমিতে চাষাবাদ হওয়ায় সারের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগই নিচ্ছে সীমান্তের চোরাকারবারিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজন ডিলারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। উখিয়ায় পাচারের ঘটনায় হওয়া প্রায় ১২টি মামলার দুটিতে ডিলারদেরও আসামি করা হয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী বলেন, সার পাচার প্রতিরোধে দলীয় নেতাকর্মী ও সীমান্তের বাসিন্দাদের সজাগ থাকতে বলা হয়েছে। সীমান্তের মানুষ সচেতন হলে পাচার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬