Loading...

হাম ও হামের উপসর্গে ভয়াবহ পরিস্থিতি
দেশে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের টিকাদানের ঘাটতি, বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করতে দুর্বল নজরদারি এবং হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।


দেশে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের টিকাদানের ঘাটতি, বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করতে দুর্বল নজরদারি এবং হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা একসঙ্গে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
১৫ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৭৬ জনের। এর মধ্যে হামসদৃশ উপসর্গে মারা গেছেন ৯৭৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯ জন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে আরও ২০ হাজার ৮৫১ জনের। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগী মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে।
হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন। সর্বশেষ হিসাবেও নতুন করে ১ হাজার ২৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ জরুরি টিকাদান কার্যক্রম চললেও সংক্রমণ এখনো থামেনি।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি টিকাদানের ফাঁক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নে, এবারের বড় প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ কয়েক বছর ধরে জমতে থাকা টিকাদানের ঘাটতি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহ এবং নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু অরক্ষিত থেকে যায়।
আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা না পাওয়া অথবা মাত্র এক ডোজ টিকা পাওয়া শিশু। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ ছিল এই বয়সসীমার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এখানেই। জাতীয় পর্যায়ে টিকার কভারেজ সন্তোষজনক দেখালেও একটি ওয়ার্ড, বস্তি বা ইউনিয়নে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকলে সেখানে সহজেই সংক্রমণের কেন্দ্র তৈরি হতে পারে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক। ফলে টিকাহীন শিশু বেশি থাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একজন আক্রান্ত রোগী থেকেই দ্রুত বড় ক্লাস্টার তৈরি হতে পারে। ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁওয়ের মতো এলাকায় প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই এমন ক্লাস্টার পাওয়া গেছে।
ভুল হিসাবও বাড়িয়েছে ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেনের মতে, পরিস্থিতি যে এতটা খারাপ হতে পারে, তার আশঙ্কা আগেই ছিল। জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা প্রয়োজনীয় হলেও শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ও টিকাদানের ঘাটতি শনাক্ত করতে পরে মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, পুরনো জনসংখ্যার তথ্যের ওপর নির্ভর করে টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে বাস্তবে কত শিশু বাদ পড়েছে, তা অজানা থেকে যেতে পারে। ফলে কাগজে টিকাদানের হার ভালো দেখালেও বাস্তবে বহু শিশু অরক্ষিত থেকে যায়।
এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু হওয়ার পর কোটি কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু সব ঝুঁকিপূর্ণ শিশু টিকা পেয়েছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

হাসপাতালের ওপর দ্বৈত চাপ
হামের বড় প্রাদুর্ভাবের প্রভাব সরাসরি পড়েছে হাসপাতালগুলোতে। মার্চের শেষ দিক থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে শিশুদের মেঝে ও করিডরে চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
সেপ্টেম্বরেও চাপ কমেনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীর জন্য নির্ধারিত ৬০টি শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। ১ হাজার ৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে একপর্যায়ে রোগী ছিল ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি।
একই সময়ে ডেঙ্গুর চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও সব রোগীকে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকদের গুরুতর রোগীদের অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
অনেক শিশুকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও তীব্র পানিশূন্যতার মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার পর। এতে চিকিৎসা কঠিন হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
হাম কেন শুধু ‘একটি রোগ’ নয়
হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। জ্বর, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতার চিকিৎসাই মূল ভরসা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে দ্বিতীয় সংক্রমণ প্রাণঘাতী হতে পারে। অর্থাৎ হাম শুধু আক্রান্তের তাৎক্ষণিক অসুস্থতা নয়; এটি শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি এবং হাসপাতালের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।

এখন সবচেয়ে জরুরি কী
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালের শয্যা বা আইসিইউ বাড়িয়ে এই সংকট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে টিকা না পাওয়া এবং দ্বিতীয় ডোজ বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে।
প্রতিটি এলাকায় দুই ডোজ হাম টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে নেওয়া, পর্যাপ্ত টিকার মজুত নিশ্চিত করা এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশু খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে অক্সিজেন, শিশু স্যালাইন, ভিটামিন-এ, আইসোলেশন এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
ছয় মাসের এই প্রাদুর্ভাব দেখিয়েছে, টিকাদানের ছোট ছোট ফাঁক বছরের পর বছর জমতে থাকলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় মৃত্যু, অতিরিক্ত রোগী এবং ভেঙে পড়া হাসপাতাল ব্যবস্থার মাধ্যমে। এখন শুধু চলমান সংক্রমণ কমানো নয়, পরবর্তী বড় প্রাদুর্ভাব ঠেকানোও জনস্বাস্থ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নবোদয়/ কেএ জেডআরসি// ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬