Loading...

প্রযুক্তি হয়ে উঠছে ক্ষমতা প্রয়োগের হাতিয়ার
এনভিডিয়ার উন্নত চিপ চীনের কোন কোম্পানি কিনতে পারবে, সেই সিদ্ধান্তে জড়িয়ে আছে ওয়াশিংটনের জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলগত হিসাব। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন কোথায় হবে, সেই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর বদলে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ।


এনভিডিয়ার উন্নত চিপ চীনের কোন কোম্পানি কিনতে পারবে, সেই সিদ্ধান্তে জড়িয়ে আছে ওয়াশিংটনের জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলগত হিসাব। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন কোথায় হবে, সেই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর বদলে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। এআই, সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রভাবের লড়াইয়ে প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হয়ে উঠছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের হাতিয়ার।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে পারস্পরিক নির্ভরতা। মার্কিন কোম্পানি এনভিডিয়া চিপের নকশা করে; তাইওয়ানের টিএসএমসি সেই ধরনের উন্নত চিপ তৈরি করে। উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র আসে নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল থেকে। ফলে কোনো একটি দেশের হাতে পুরো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু অপরিহার্য কোনো ধাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অন্য দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলা যায়।
তাইওয়ান এই ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল কেন্দ্রগুলোর একটি। মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থা সিআরএসের ২০২৫ সালের মার্চের হিসাবে, বিশ্বের উন্নত চিপ উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ তাইওয়ানভিত্তিক এবং টিএসএমসির মাধ্যমে হয়। অ্যাপল ও এনভিডিয়া প্রতিষ্ঠানটির বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির উৎপাদনে পারস্পরিক নির্ভরতার বড় উদাহরণ এটি।
এখানেই তাইওয়ানের চিপশিল্প তাকে কৌশলগত গুরুত্ব দেয়, আবার বিশ্ব অর্থনীতির দুর্বলতাও প্রকাশ করে। গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন সীমিত জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকায় বিকল্প সরবরাহ গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়ে। চিপের ওপর নির্ভরতা যুদ্ধ ঠেকাবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে সংঘাতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসাব করতে গেলে তাইওয়ানের কারখানাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
চীনের উন্নত প্রযুক্তির অগ্রগতি সীমিত করতে ওয়াশিংটন এই সরবরাহ ব্যবস্থাকেই কাজে লাগাচ্ছে। ২০২২ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট উন্নত কম্পিউটিং চিপ, উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করে।
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, এসব প্রযুক্তি চীনের উন্নত সামরিক ব্যবস্থা ও সুপারকম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে বাণিজ্যের অনুমতির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন যুক্ত হয়। নির্দিষ্ট কিছু বিদেশে তৈরি উন্নত কম্পিউটিং পণ্যও এসব বিধির আওতায় আসে। ফলে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন ভূখণ্ড ছাড়িয়ে বিশ্ববাণিজ্যেও প্রভাব ফেলে।

তবে এই প্রতিযোগিতা কেবল বিক্রি বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি জানায়, এনভিডিয়ার এইচ২০০, এএমডির এমআই৩২৫এক্স এবং সমজাতীয় চিপ চীনে রপ্তানির আবেদন নিরাপত্তার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ কোন প্রযুক্তি, কোন ক্রেতা এবং কোন শর্তে পাবে, সেখানেও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কাজ করছে।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন গ্রাহকদের জন্য উপলব্ধ উৎপাদনক্ষমতা কমানো যাবে না; চীনা ক্রেতাকে রপ্তানি বিধি মানার ব্যবস্থা রাখতে হবে; যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দিয়ে পণ্য পরীক্ষা করাতে হবে। এই নীতিতে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও নিরাপত্তার হিসাব পাশাপাশি রয়েছে। এর অর্থ সব উন্নত চিপে বাধা উঠে যাওয়া নয়; অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের হাতেই থাকছে।
২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে নির্দিষ্ট পরিমাপ ও পরীক্ষার সরঞ্জামসহ আরও কিছু চিপ উৎপাদন প্রযুক্তি রপ্তানিতে অনুমতির বিধান সম্প্রসারণ করে ডাচ সরকার। তাদের যুক্তি, নিয়ন্ত্রণহীন রপ্তানি সামরিক ব্যবহারের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের গন্তব্যে প্রযোজ্য এই ব্যবস্থা সার্বিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নয়। কিন্তু প্রযুক্তি কোথায় যাবে, সেই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়।
একই সঙ্গে চলছে নিজের ভূখণ্ডে উৎপাদন আনার প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের চিপস অ্যাক্টে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প শক্তিশালী করতে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি বলছে, এর লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় চিপের জোগান এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখা রয়েছে।

এই পরিবর্তনের উদাহরণ টিএসএমসি। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ১৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় তিনটি নতুন উৎপাদন কারখানা, দুটি উন্নত প্যাকেজিং স্থাপনা এবং গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত চিপের উৎপাদন ও প্যাকেজিং সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগই সরবরাহের ভৌগোলিক ঝুঁকি কমাতে ওয়াশিংটনের চেষ্টাকে সামনে আনে।
চীনও বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে অর্থ ঢালছে। ২০২৪ সালের মে মাসে দেশটির রাষ্ট্রীয় সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ তহবিলের তৃতীয় পর্যায় গঠিত হয়, যার নিবন্ধিত মূলধন ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি ইউয়ান। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চিপস অ্যাক্টের মাধ্যমে উৎপাদন ও গবেষণা শক্তিশালী করছে। এসব উদ্যোগ দেখায়, চিপের কারখানা কোথায় হবে, তা এখন অর্থনীতির পাশাপাশি কৌশলগত নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত।
তবে চিপ নিয়ন্ত্রণ করলেই প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্ভাবন পুরোপুরি থামবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিকের ভি-৩ মডেলের গবেষণাপত্রে অ্যালগরিদম ও প্রকৌশলগত উন্নয়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের দক্ষতা বাড়ানোর বিবরণ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এনভিডিয়ার এইচ৮০০ চিপ ব্যবহার করেছে। তাদের প্রায় ৫৬ লাখ ডলারের হিসাব শুধু ভি-৩ মডেলের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণব্যয়; আগের গবেষণা ও পরীক্ষার খরচ এতে নেই। তাই এই অঙ্ক দিয়ে পুরো এআই উন্নয়নের খরচ বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
এই নীতি ও বিনিয়োগের ধারা থেকে স্পষ্ট, প্রযুক্তিতে পারস্পরিক নির্ভরতা এখন রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকার সুবিধা ধরে রাখতে চায়; চীন বিকল্প সক্ষমতা গড়তে চায়; তাইওয়ান ও নেদারল্যান্ডস গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও যন্ত্রের কারণে কৌশলগত অবস্থান পায়। কার কাছে প্রযুক্তি থাকবে এবং কে তার প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নেই বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার হিসাব বদলাচ্ছে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬