Loading...

ইরান যুদ্ধের সাত মাস: বড় প্রভাব জ্বালানিতে
সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কাতারের এলএনজি সরবরাহ নিয়ে। কাতারএনার্জি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি এশীয় ক্রেতাকে জানিয়েছে, হরমুজ পরিস্থিতির কারণে নভেম্বর পর্যন্ত কিছু নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।


ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সাত মাস পার করেছে। যুদ্ধ বন্ধে আবার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হলেও একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, ইয়েমেনে হুতিদের তৎপরতা বেড়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে।
ফলে সংঘাতটি এখন আর শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর কয়েক দফা হামলা-পাল্টা হামলার পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগও হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুবার সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সর্বশেষ নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করেছেন দুই দেশের কর্মকর্তারা। ইরানের দেওয়া সাত দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করলেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির বড় একটি অংশ এই সরু নৌপথ দিয়ে যায়। যুদ্ধের পর সেখানে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিছু এলএনজি ও তেলবাহী জাহাজ চললেও পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং নিরাপত্তাঝুঁকি অনেক বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাসের দামে।

ইরান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা এবং কিছু সামরিক ও রাজনৈতিক শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হবে না। ফলে প্রণালিটি এখন শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরব ও লোহিত সাগরসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে হামলা বাড়িয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের দিকে তেল নেওয়ার বিকল্প পাইপলাইনও নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছে। এই পথটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির অন্যতম বিকল্প এটি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও হরমুজের বাইরে ফুজাইরাহ বন্দরসহ বিকল্প রপ্তানিপথের ব্যবহার বাড়িয়েছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তায় এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, নিরাপদে তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর সক্ষমতাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কাতারের এলএনজি সরবরাহ নিয়ে। কাতারএনার্জি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি এশীয় ক্রেতাকে জানিয়েছে, হরমুজ পরিস্থিতির কারণে নভেম্বর পর্যন্ত কিছু নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পে আমদানি করা এলএনজির ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো না এলে স্পট বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হতে পারে। তা সম্ভব না হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পে সরবরাহ সীমিত করার চাপ বাড়তে পারে। উচ্চ তেলের দাম আবার ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের পরিস্থিতিও প্রায় একই। দেশটি কাতারি এলএনজির বড় ক্রেতা এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্য এর বৈদেশিক মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিবেশী হওয়ায় পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবেও এই সংঘাতের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন কিছুটা ভিন্ন। দেশটির সরবরাহ উৎস তুলনামূলকভাবে বহুমুখী হলেও বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল ও রুপির ওপর চাপ পড়ে। একই সঙ্গে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, রাশিয়ার তেল, উপসাগরীয় দেশগুলোর সরবরাহ এবং ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগ, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাই সরাসরি সামরিক নয়, অর্থনৈতিক। দীর্ঘ যুদ্ধ মানে উচ্চ তেল ও এলএনজি মূল্য, বেশি পরিবহন ব্যয়, আমদানি বিল বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ের সম্পর্কও রয়েছে।
কোনো সমঝোতায় হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরলে তা দক্ষিণ এশিয়াকে দ্রুত কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাড়তি নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে যুদ্ধ বন্ধ হলেই বাজার পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সাত মাসের এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আর দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়। হরমুজে একটি ট্যাংকার আটকে যাওয়া, কাতারের একটি এলএনজি কার্গো বাতিল হওয়া কিংবা সৌদি আরবের একটি পাইপলাইনে হামলা, সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ঢাকা, ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে গিয়ে পড়ে।
নবোদয়/ কেএ/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬