Loading...

কন্যাশিশুর সুরক্ষায় বিনিয়োগ
কন্যাশিশুকে স্কুলে ভর্তি করানো ও ভালো ফলের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কিন্তু যেসব মেয়ের পড়াশোনা এরই মধ্যে থেমে গেছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সহায়তা তাদের কাছেও পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশভিত্তিক একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ে বিলম্বিত করার শর্তে পরিবারকে সহায়তা দিলে বাল্যবিবাহ কমে।


কন্যাশিশুকে স্কুলে ভর্তি করানো ও ভালো ফলের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কিন্তু যেসব মেয়ের পড়াশোনা এরই মধ্যে থেমে গেছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সহায়তা তাদের কাছেও পৌঁছাতে হবে।
বাংলাদেশভিত্তিক একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ে বিলম্বিত করার শর্তে পরিবারকে সহায়তা দিলে বাল্যবিবাহ কমে। সর্বশেষ জাতীয় জরিপে প্রায় অর্ধেক তরুণীর অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের তথ্য সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রয়োজন সামনে আনছে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ। ইউনিসেফের হিসাবে, বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের বিয়ে হয় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই। বর্তমানে জীবিত প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবে বিয়ের শিকার হয়েছেন। এই সংকটের সঙ্গে শিক্ষা হারানো, সহিংসতা ও ভবিষ্যতের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ারও আগে। একই বয়সি নারীদের মধ্যে ২০১৯ সালে প্রথম হারটি ছিল ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ। ছয় বছরে কমেছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট। অগ্রগতি আছে, তবে সংকট এখনো বড়।
শিক্ষার হিসাবেও সতর্ক হওয়ার কারণ রয়েছে। এমআইসিএসে ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার হার ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরা অবশ্যই সম্ভাবনার প্রমাণ। কিন্তু যাদের পড়াশোনা আগেই থেমেছে, তাদের অবস্থার বিচার পরীক্ষার ফল দিয়ে করা যায় না। কন্যাশিশুর অগ্রগতি মাপতে তাই বিদ্যালয়ে প্রবেশের পাশাপাশি শিক্ষায় টিকে থাকা, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও দেখতে হবে।
পরিবারের সহায়তা কীভাবে কাজে আসতে পারে, তার উদাহরণ বাংলাদেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের ছয় উপজেলায় পরিচালিত একটি পরীক্ষা। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি অবিবাহিত মেয়েদের পরিবারকে নির্দিষ্ট বিরতিতে রান্নার তেল দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, মেয়ের বয়স ১৮ হওয়ার আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না। স্কুলে উপস্থিতির শর্ত ছিল না; অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৩৫ শতাংশ শুরুতেই স্কুলের বাইরে ছিল।

জে-প্যালের প্রকাশিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, সহায়তা পাওয়া এলাকার মেয়েদের ১৮ বছরের আগে বিয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক এলাকার চেয়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট কম ছিল। আপেক্ষিক হিসাবে হ্রাস ১৭ শতাংশ। কর্মসূচি শেষ হওয়ার এক বছর পর স্কুলে থাকার সম্ভাবনাও ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি পাওয়া যায়। গবেষণাটি ২০২৩ সালে আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউতে প্রকাশিত হয়।
স্কুলের বাইরে থাকা মেয়ের জন্য সহায়তা পাওয়ার সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে ফিরতে না পারা পর্যন্ত কোনো মেয়েকে সুরক্ষার কর্মসূচির বাইরে রাখলে তার জীবনের জরুরি সময়ে সহায়তার ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
জে-প্যালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাকের সঙ্গে এই প্রণোদনা ১ হাজার ৯০০ গ্রামে সম্প্রসারণের উদ্যোগ চলছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার কিশোরী প্রণোদনা পেয়েছে। সম্প্রসারণের সঙ্গে ফল মূল্যায়নও জরুরি—কারা সহায়তা পেল, কতজনের বিয়ে পিছিয়েছে এবং কতজন পড়াশোনায় ফিরেছে, সেই হিসাবই কার্যকারিতা বোঝাবে।
মেয়ের মতামত, নিরাপদ পরিবেশ এবং বয়স যাচাই নিশ্চিত করার সঙ্গে পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রণোদনা এই ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে। সহায়তা যেন ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের কাছে পৌঁছায় এবং মেয়ের শিক্ষা ও প্রয়োজনের কাজে লাগে, তার তদারকিও জরুরি।
ইউনিসেফ শিক্ষা, আইনি সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কার্যকর পথ হিসেবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের সামনে তাই কাজ হলো শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষার উদ্যোগের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা। স্থানীয় পর্যায়ে স্কুলের বাইরে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ মেয়েদের শনাক্ত করে পরিবারকে সহায়তা, শিক্ষায় ফেরার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় সেবা একসঙ্গে দেওয়া গেলে প্রতিরোধের পরিসর বাড়তে পারে। সাফল্যের হিসাব হবে একটি মেয়ের নিরাপদে বড় হওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ১১ অক্টোবর ২০২৬