Loading...

পুরনো অপরাধ কমলেও তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকির জায়গা
আইনের ধারাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পুরোনো অপরাধের পরিধি কমেছে, কিছু মামলা বাতিলের পথ তৈরি হয়েছে এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের জন্য নতুন বিধান এসেছে। কিন্তু তদন্ত, তথ্য সংরক্ষণ, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।


২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে যে আইনি কাঠামোর শুরু, আট বছরের মধ্যে সেটির নাম বদলেছে একাধিকবার। ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে আনা হয় সাইবার নিরাপত্তা আইন। ২০২৫ সালে সেটিও বাতিল করে জারি হয় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ। এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে অধ্যাদেশটি রহিত করে প্রণয়ন করা হয় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬। জুলাইয়ে আবার এই আইনের একটি সংশোধনী আনা হয়েছে। ফলে নাম বদলের ধারাটি স্পষ্ট হলেও আসল প্রশ্ন থেকে গেছে। আইনের কাঠামোতে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে?
২০১৮ সালের আইনটি ছিল বিস্তৃত পরিসরের। এর ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা নিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারকে অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য প্রকাশের বিধান ছিল। ২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ২৯ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি এবং ৩১ ধারায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা শত্রুতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির মতো বিষয়কে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছিল। এসব ধারার কয়েকটিতে কারাদণ্ডের বিধানও ছিল।
২০২৩ সালে নাম বদলালেও পুরো কাঠামো একেবারে নতুন করে লেখা হয়নি। সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের সময় ২০১৮ সালের আইনকে সরাসরি রহিত করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের আইনে ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, ভীতি প্রদর্শক বা মিথ্যা তথ্যের বিধান, ২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতি এবং ২৯ ধারায় মানহানির বিধান থেকে যায়। তবে শাস্তির কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। ২০২৩ সালের ২৯ ধারায় অনলাইন মানহানির জন্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান ছিল; কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি।
২০২৩ সালের আইনে আরও একটি পরিবর্তন ছিল ব্যক্তিগত তথ্যের ক্ষেত্রে। ২৬ ধারায় অনুমতি ছাড়া অন্যের পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, বিক্রি, দখল, সরবরাহ বা ব্যবহারের অপরাধ নির্ধারণ করা হয়। নাম, ছবি, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, আঙুলের ছাপ, ই-টিআইএনসহ বিস্তৃত তথ্যকে পরিচিতি তথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। অর্থাৎ সাইবার আইন তখন শুধু অনলাইন বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের আইন না থেকে ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল অপরাধের দিকেও আরও স্পষ্টভাবে বিস্তৃত হচ্ছিল।
এরপর ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। সরকার নয়টি ধারা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা, অনলাইন মানহানি ও কিছু তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিতর্কিত বিধান ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এসব ধারা বাতিলের ফলে ২০২৩ সালের আইনের অধীনে চলমান মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অনলাইন যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপরাধের মতো নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়।
কিন্তু ২০২৫ সালের পরিবর্তনকে শুধু আইন শিথিল হয়েছে বললেও পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ সাইবার অপরাধের মূল কাঠামো বহাল ছিল। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে হামলা, বেআইনি প্রবেশ, জালিয়াতি, প্রতারণা এবং সাইবার সন্ত্রাসের মতো অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়। একই সঙ্গে তদন্ত ও ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বহাল থাকে।
২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন মূলত ২০২৫ সালের অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিয়েছে, তবে এর মধ্যে নতুন সংযোজনও রয়েছে। আইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেইন, ক্লাউড কম্পিউটিংসহ আধুনিক প্রযুক্তিকে সাইবার পরিসরের অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। নাগরিকের সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট প্রাপ্তির অধিকারও সাইবার সুরক্ষার সংজ্ঞার অংশ হয়েছে।
নতুন আইনের ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, শিশু যৌন নিপীড়নের উপাদান এবং যৌন হয়রানিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত উপাদান প্রকাশের মতো অপরাধ স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২৬ ধারায় ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তবে সেখানে সহিংসতা, উদ্বেগ, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনার মতো নির্দিষ্ট উপাদান যুক্ত করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের ক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালের আইনের ৩৫ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে সাইবার হামলা বা কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র কিংবা ব্যবস্থায় বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে তথ্য মুছে ফেলা, পরিবর্তন বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে পুলিশ কারণ লিখে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ অনলাইন মতপ্রকাশের কিছু পুরোনো ধারা বাদ গেলেও সাইবার অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কিছু শক্তিশালী ক্ষমতা এখনও রয়েছে।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ২০২৬ সালের আইনে সব অপরাধ সমানভাবে আমলযোগ্য বা অজামিনযোগ্য নয়। ৪৬ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধকে আমলযোগ্য এবং কয়েকটি গুরুতর অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা হয়েছে; অন্য অনেক অপরাধ জামিনযোগ্য। যেমন ১৭, ১৮(১) (গ), ১৯, ২২ ও ২৩ ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য, অন্যদিকে ২১, ২৪, ২৫ ও ২৬ ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। ফলে সাইবার আইনে সব অপরাধেই পুলিশ ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার করতে পারে এমন সাধারণীকরণও সঠিক হবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৬ সালের আইন ২০২৫ সালের অধ্যাদেশকে শুধু নাম বদলে প্রতিস্থাপন করেনি; পুরোনো মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থা রেখেছে। ২০২৩ সালের আইনের কিছু নির্দিষ্ট ধারার অধীনে চলমান মামলা নতুন আইনের অধীনেও চলবে বলে বলা হয়েছে। আবার ২০১৮ সালের আইনের কয়েকটি ধারার অধীনে চলমান মামলা ও তদন্ত বাতিল এবং সেসব ধারায় দেওয়া দণ্ড ও জরিমানা বাতিল বলে গণ্য করার বিধানও রাখা হয়েছে।
এখানে সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের আইনে যে কয়েকটি ধারা সংবাদ, মন্তব্য, সমালোচনা বা অনলাইন বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করেছিল, তার একটি বড় অংশ পরবর্তী পরিবর্তনগুলোতে বাদ গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে নয়টি ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অনলাইনে প্রকাশিত যেকোনো বক্তব্য এখন আইনের বাইরে। বর্তমান আইনে সাইবার প্রতারণা, পরিচয় অপব্যবহার, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ থেকে সহিংসতা সৃষ্টি, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং সাইবার হামলার মতো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে রয়েছে।
সবশেষে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সংশোধনটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে মূল আইনের ২০ ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আইনটি এপ্রিলেই চূড়ান্ত হয়ে থেমে যায়নি; কয়েক মাসের মধ্যেই আবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে।
আট বছরের এই ধারাবাহিকতা তাই একটি সরল নাম বদলের গল্প নয়। ২০১৮ সালের আইনে মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট একাধিক বিস্তৃত অপরাধ ছিল। ২০২৩ সালে কিছু শাস্তি ও কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও বেশ কিছু বিতর্কিত বিধান রয়ে যায়। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে সেগুলোর বড় অংশ বাদ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ যুক্ত হয়। ২০২৬ সালের আইনে সেই কাঠামোকে স্থায়ী আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকিও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
আইনের ধারাগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পুরোনো অপরাধের পরিধি কমেছে, কিছু মামলা বাতিলের পথ তৈরি হয়েছে এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের জন্য নতুন বিধান এসেছে। কিন্তু তদন্ত, তথ্য সংরক্ষণ, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি। ফলে নতুন আইনকে বুঝতে হলে শুধু নাম বা সরকারের বক্তব্য নয়, ধারাগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
নবোদয়/ আরআই/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬