Loading...

ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের অচলাবস্থা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম শুধু কত ব্যারেল রপ্তানি হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই তেল কোন পথে কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে পৌঁছাবে, সেটিও বাজারের প্রশ্ন। সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়েছে।


বিশ্ববাজারে তেলের দাম শুধু কত ব্যারেল রপ্তানি হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই তেল কোন পথে কতটা নিশ্চয়তার সঙ্গে পৌঁছাবে, সেটিও বাজারের প্রশ্ন। সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়েছে।
কিন্তু ইরানের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকচ করার পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দাম আবার চড়েছে। বাড়তি রপ্তানির মধ্যেও কেন স্বস্তি ফিরছে না, তার একটি ব্যাখ্যা রয়েছে বর্তমান সরবরাহ ও যুদ্ধের আগের সরবরাহের ব্যবধানে।
সোমবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৮টা ৩ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ৯২ ডলারে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে হয় ৯৪ দশমিক ৪৯ ডলার। অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের হামাদ হুসাইন রয়টার্সকে বলেছেন, ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান তেলের দাম বাড়ার একটি কারণ বলে মনে হচ্ছে।
বাজারে তেল আসছে না—এমন ধারণাও ঠিক নয়। জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক হিসাবে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রপ্তানি বাড়ানোয় সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলো দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সেপ্টেম্বরে দৈনিক প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেল রপ্তানি হওয়ার পূর্বাভাসও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে যুদ্ধের আগের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে ঘাটতিটি বোঝা যায়। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে একই দেশগুলোর দৈনিক রপ্তানি ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে বৃদ্ধির পরও ব্যবধান দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল। সৌদি আরবের পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের বদলে উপসাগরীয় রাস তানুরা দিয়ে বেশি তেল পাঠাচ্ছে।
কেপলারের হিসাবে, গত সপ্তাহে সৌদি তেলবাহী ১৯টি বড় জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। তবে শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ রেখে চলা কোনো জাহাজ এই হিসাবে নাও থাকতে পারে। আবার ব্যারেলে তেল রপ্তানির পরিমাণ দিয়ে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ কিংবা তরলীকৃত গ্যাসবাহী জাহাজের চলাচলের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। তাই তেল রপ্তানি বাড়াকে প্রণালির সব ধরনের নৌ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সমার্থক ধরা যাবে না।
হরমুজের অনিশ্চয়তা কাটানোর একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। সাত দিনের পরিকল্পনায় তেহরান চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ তুলে নেবে, তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, আটকে থাকা আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড়বে এবং লেবানন ও ইয়েমেনসহ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে। এরপর ইরান প্রণালি খুলে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে। কাতারের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়। কোন পক্ষ আগে ছাড় দেবে, সেটিও তাই বিরোধের কেন্দ্রে।
শর্তের এই ক্রম নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের সহযোগী ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজ। গত জুনে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকও শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে আগস্টে ভেস্তে যায় বলে জানানো হয়েছে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে।

শনিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ইরানের প্রস্তাব তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, যদিও তিনি একটি চুক্তি চান। রবিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিক জবাব পাননি। অন্যদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে আরও আলোচনার প্রত্যাশার কথাও বলেছেন।
আল-জাজিরাকে ওয়েইটজ বলেছেন, হোয়াইট হাউস হয়তো মনে করছে, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও চললে ইরান বেশি ছাড় দেবে। গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের পর্যবেক্ষণ, চাপ বাড়া মানেই ইরান আত্মসমর্পণে রাজি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তার মতে, তেহরান হরমুজ, আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনা বা বাব আল-মানদেব ঘিরে প্রতিপক্ষের খরচ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
উপসাগরের বাইরের পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট শনিবার হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ও দুটি ড্রোন প্রতিহতের কথা জানিয়েছে। ফলে হরমুজের বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরের নিরাপত্তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অপেক্ষার মূল্য ওয়াশিংটনের জন্যও রয়েছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় ভোটারদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
আগস্টের রয়টার্স–ইপসোস জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেন; সমর্থন জানান ৩১ শতাংশ। তবে এক দিনের তেলের দাম দেখে নির্বাচনের ফল বা যুদ্ধের পরবর্তী গতি নির্ধারণ করা যায় না।
সোমবারের বাজারে তাই দুটি তথ্য পাশাপাশি রয়েছে- গত কয়েক মাসের তুলনায় হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানি বেড়েছে, আবার যুদ্ধের আগের তুলনায় অঞ্চলটির মোট রপ্তানি যথেষ্ট কম। এই ব্যবধান কত দিন থাকবে এবং আলোচনায় কোন পক্ষ আগে ছাড় দেবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬