Loading...

ভেষজ চাষে কৃষকের আয়, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল
ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার ব্যবসা। অ্যালোভেরা, নিম, আমলকীসহ নানা উদ্ভিদ ওষুধশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করে আয় করছেন হাজারো মানুষ।


ভেষজ উদ্ভিদের চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার ব্যবসা। অ্যালোভেরা, নিম, আমলকীসহ নানা উদ্ভিদ ওষুধশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করে আয় করছেন হাজারো মানুষ। কৃষকের বাড়তি আয় ও নারীর কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশীয় ওষুধশিল্পের চাহিদা মেটানোর সুযোগ তৈরি করছে এই খাত। তবে ব্যবসা বাড়াতে প্রয়োজন মানসম্মত উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা এবং কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়ার ব্যবস্থা।
গাজীপুরের শ্রীপুরে বাড়ির উঠানে শুকানো পাতা, ছাল ও শিকড় দেশের ওষুধশিল্পের কাঁচামাল হয়ে যাচ্ছে। দরগাচালা ও ডালেশ্বরের এই উদাহরণ ভেষজ উদ্ভিদ গ্রামীণ জীবিকার পাশাপাশি কৃষি ও শিল্পের সংযোগও গড়তে পারে। সম্ভাবনা বাড়ানোর পথে বড় প্রশ্ন এখন—কৃষকের উৎপাদন কীভাবে পরীক্ষিত মানের পণ্যে পরিণত হবে এবং সেই বাড়তি আয়ের কতটা তাঁর হাতে থাকবে।
গ্রাম দুটির প্রায় ৩০০ পরিবারের জীবিকা চলছে এই ভেষজ চাষকে কেন্দ্র করে। সংগ্রহ, বাছাই, শুকানো, প্যাকেজিং ও পরিবহনে আশপাশের মানুষেরও কাজ হচ্ছে। নারীরা প্রক্রিয়াজাতকরণে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, বছরে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। বন থেকে সংগ্রহের পাশাপাশি উঠানে চাষও শুরু হয়েছে।
বাণিজ্যিক চাষের বড় উদাহরণ নাটোরের লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, সেখানে ১৫৫ হেক্টরে ভেষজ আবাদ হচ্ছে; যার ৭০ হেক্টরে অ্যালোভেরা। প্রায় দুই হাজার কৃষক যুক্ত। অশ্বগন্ধা, শিমুলমূল ও শতমূলসহ নানা উদ্ভিদ উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত ভেষজের বাজারমূল্য অন্তত শত কোটি টাকা বলা হয়েছে। অ্যালোভেরা যাচ্ছে ওষুধ, প্রসাধনী ও পানীয় তৈরির প্রতিষ্ঠানে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও কৃষিশ্রমে প্রায় ১০ হাজার মানুষ জড়িত।

ভেষজের বিস্তার পরীক্ষামূলক আবাদেও দেখা যাচ্ছে। বারির বিজ্ঞানীরা বগুড়া, গাজীপুর, লালমনিরহাট ও ফরিদপুরে ইসবগুল চাষে সফলতা পেয়েছেন। মাগুরার আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রেও গবেষণা চলছে। তবে এসব উদ্যোগের বাণিজ্যিক সক্ষমতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অবদানের একটি পথ আমদানির বিকল্প তৈরি। এনবিআরের তথ্য অনুয়ায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় দুই হাজার ৭০০ টন ইসবগুলের ভুসি আমদানি হয়েছে। দেশে গ্রহণযোগ্য মান ও প্রতিযোগিতামূলক দামে ভুসি উৎপাদিত হলে এই চাহিদার অংশ স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব। এতে কৃষকের বাজার তৈরি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ থাকবে। তবে বীজ উৎপাদন, ভুসি তৈরি ও বাজারজাতকরণ—তিনটি ধাপেই সক্ষমতা দরকার।
এই ব্যবধানই তুলে ধরেছেন মাগুরার আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম। তিনি জানান, ইসবগুলের বীজ থেকে ভুসি তৈরির উপযোগী প্রযুক্তি দেশে নেই। তাঁর বক্তব্য, ‘এ কারণে আমরা এখনো কৃষকদের এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে বলছি না।’
কর্মসংস্থানের সুযোগও খেতের বাইরে বিস্তৃত। নার্সারি, শুকানো, সংরক্ষণ, নির্যাস তৈরি ও পরিবহনে স্থানীয় উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে। বাড়ির আঙিনা ও উপযুক্ত জমির আইল ব্যবহার কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। তবে প্রজাতিভেদে মাটি, পানি, সংগ্রহের সময় ও ক্রেতার চাহিদা আলাদা। খাদ্যফসলের জমি বদলানোর সিদ্ধান্তে লাভ, ঝুঁকি ও বাজার যাচাই জরুরি; সব ভেষজ একইভাবে লাভজনক ধরে নেওয়া ভুল হবে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাড়ির আঙিনায় ঔষধি গাছ চাষে উৎসাহ, চারা বিতরণ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই সহায়তার সঙ্গে কোম্পানির চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন এবং আগাম ক্রয়চুক্তি যুক্ত হলে কৃষকের অনিশ্চয়তা কমতে পারে। স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা থাকলে বিক্রির আগে পণ্যের মূল্য বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতার মান, ধারাবাহিক সরবরাহ ও উৎসের নথির শর্ত পূরণ করতে পারলে রপ্তানির বাজার খোলার সম্ভাবনাও থাকবে। তবে এ জন্য পরীক্ষাগার ও বাজারসংযোগে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

চিকিৎসা ও ফার্মেসির বাজারে ভেষজের ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটু মিয়া বলেছেন, পানি ধারণের ক্ষমতার কারণে ইসবগুলের ভুসি কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী। দেশীয় ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধে উদ্ভিদজাত কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ওষুধ উদ্ভাবনেও উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উইলো গাছের ঐতিহ্যগত ব্যবহার থেকে অ্যাসপিরিনের গবেষণা এবং প্রাচীন চীনা চিকিৎসাজ্ঞান থেকে ম্যালেরিয়ার ওষুধ আর্টেমিসিনিন আবিষ্কারের উদাহরণ দিয়েছে। এসব অর্জনের সঙ্গে কার্যকর উপাদান শনাক্তকরণ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কঠোর বৈজ্ঞানিক যাচাই এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত সংস্থাটির গবেষণা অগ্রাধিকারেও নিরাপদ, কার্যকর চিকিৎসায় প্রমাণ কাজে লাগানোর কথা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেষজ গবেষণায় উদ্ভিদের পরিচয়, উপাদানের ধারাবাহিক মান এবং রোগীর ওপর ফলাফল যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ৮ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের জিএমপি নির্দেশিকাও মানসম্মত উৎপাদনের গুরুত্ব সামনে আনে। পরিচ্ছন্ন শুকানো, সংরক্ষণ, দূষণ পরীক্ষা ও কাঁচামালের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা শিল্পের আস্থা বাড়াতে পারে। পরিকল্পিত চাষ বন থেকে নির্বিচার ছাল–শিকড় সংগ্রহের চাপও কমাতে পারে; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ খাতে প্রয়োজন উৎপাদন, খরচ, মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের সমন্বিত তথ্য। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ হলো কৃষক, গবেষক ও প্রস্তুতকারকের সহযোগিতায় নির্ভরযোগ্য সরবরাহ গড়া। প্রযুক্তি, ন্যায্য ক্রয়মূল্য ও প্রমাণভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে, উঠানের এই উদ্যোগ কত দূর শিল্পের বাজারে পৌঁছাবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ১১ অক্টোবর ২০২৬