Loading...

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংকট চরমে
উৎপাদন থেকে পরিবহন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়ছে। কিন্তু অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে খরচ যতটা বাড়ছে, খুচরা দাম বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে সেই হারে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারদরের সমস্যা নয়, তা মানুষের জীবনযাত্রা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সংকটে রূপ নিচ্ছে।


চার বছর ধরে চড়া নিত্যপণ্যের বাজার। এর মধ্যে আবার বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। উৎপাদন থেকে পরিবহন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়ছে। কিন্তু অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে খরচ যতটা বাড়ছে, খুচরা দাম বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি।
অন্যদিকে সেই হারে বাড়ছে না মানুষের আয়। ফলে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারদরের সমস্যা নয়, তা মানুষের জীবনযাত্রা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সংকটে রূপ নিচ্ছে।
ঢাকার মাছের বড় একটি অংশ আসে ময়মনসিংহসহ আশপাশের জেলা থেকে। ত্রিশালের ব্যবসায়ী আলী হোসেন একটি ট্রাকে প্রায় ৪০ মণ মাছ ঢাকায় আনেন। জ্বালানির দাম বাড়ার পর তার ট্রাকভাড়া বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা।
হিসাব করলে কেজিপ্রতি মাছের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দেড় টাকারও কম। অথচ রাজধানীর কয়েকটি বাজারে চাষের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ জ্বালানির সরাসরি ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা বাজারের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম যোগ হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।
Add image

চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ
বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের চাপ শুরু হয় ২০২২ সালে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয়ও বাড়ে।
এর পর থেকে দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করেছে। আগে যে আয় দিয়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় চালানো যেত, এখন একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে প্রয়োজন অনেক বেশি অর্থ।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দীর্ঘ মূল্যস্ফীতি ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় মানুষ টিকে থাকতে অনানুষ্ঠানিক কাজে ঝুঁকছেন।
ফুটপাতে দোকান দেওয়া, ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর মতো কাজ বাড়ছে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু বাজারদরে সীমাবদ্ধ নেই; কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ধরনেও এর প্রভাব পড়ছে।
ডিম-মাংসে বড় চাপ
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আমিষের তুলনামূলক সস্তা উৎস ছিল ডিম ও মুরগি। সেই জায়গাতেও চাপ বেড়েছে। ২০২২ সালের আগে ফার্মের বাদামি ডিমের দাম সাধারণত ডজনপ্রতি ৯০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে থাকত। এখন তা ১২০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। রাজধানীতে ডজনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকায় ডিম বিক্রি হচ্ছে।
ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় আমিষ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সমস্যাটি শুধু খুচরা বাজারে নয়। মুরগির বাচ্চা, পোলট্রি খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। আবার আমদানি সীমিত থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তাদের মতে, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা নিশ্চিত রেখেই প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত আমদানি অথবা শুল্ক সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।

সরবরাহ থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণের নজির
সব পণ্যের চিত্র এক নয়। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় মৌসুমের শেষ দিকেও পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকার আশপাশে। আলু পাওয়া যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। এ উদাহরণ দেখায়, উৎপাদন ও সরবরাহ যথেষ্ট থাকলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে।
এর বিপরীত চিত্র এলপিজির বাজারে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ কোথাও সমস্যা সরবরাহের, কোথাও প্রতিযোগিতার, কোথাও আবার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারার।
খাবারেই আয় শেষ
জীবনযাত্রার সংকটটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয় আয় ও খাবারের খরচ তুলনা করলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নগর আর্থসামাজিক জরিপে ব্যবহৃত খাদ্যচাহিদা এবং বর্তমান বাজারদর ধরে করা হিসাবে ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাবারের মাসিক খরচ প্রায় ২৬ হাজার ৮৮৪ টাকা। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ যুক্ত হয়নি।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ফলে পরিবারের একাধিক সদস্য আয় না করলে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই কঠিন।
মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকের নিরাপত্তাকর্মী আনসার হোসেন মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পান। তাঁর স্ত্রী গৃহকর্মীর কাজ করে আরও প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আয় করেন। তারপরও সংসার চালাতে মাস শেষে ধার করতে হয়। তার ভাষায়, ‘এসব কথা কইয়া কী লাভ হইব। আমগো কথা তো কেউ শোনে না। দামও কমবো না।’
জ্বালানি সংকটে নতুন ঝুঁকি
নতুন করে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়। ডিজেল পরিবহন, কৃষি, সেচ ও শিল্প উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর দাম বাড়লে শুধু ট্রাক বা বাসের ভাড়া নয়, কৃষিপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিল্পে ব্যয় বাড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ যদি জ্বালানি, আমদানি, উৎপাদন খরচ, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি থেকে আসে, তাহলে সমস্যাও পণ্যভিত্তিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

দরকার ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ
বাজার নিয়ন্ত্রণে অতীতে অভিযান, জরিমানা ও মূল্যতালিকা টাঙানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে দাম কমাতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দরকার উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী শুল্ক সমন্বয় বা সীমিত আমদানি, উৎপাদন খরচ কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় অস্বাভাবিক মুনাফা ঠেকানো।
তাই মূল্যস্ফীতিকে শুধু একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। মানুষের প্রকৃত আয়, কর্মসংস্থান ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত না হলে অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
বর্তমান সংকটে তাই একক কোনো ব্যবস্থা নয়, দরকার পণ্যভিত্তিক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উদ্যোগ।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬