Loading...

ডিজিটাল ব্যাংক
দেশের বড় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ এবং দুই মোবাইল অপারেটরের উদ্যোক্তারা এবার সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবসায় আসার পথে। বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চারটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটার বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপের নোভা ডিজিটাল ব্যাংক। অন্যটি ভুটানের ডিকে ব্যাংকের উদ্যোক্তায় ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান।


দেশের বড় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ এবং দুই মোবাইল অপারেটরের উদ্যোক্তারা এবার সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবসায় আসার পথে। বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চারটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটার বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপের নোভা ডিজিটাল ব্যাংক। অন্যটি ভুটানের ডিকে ব্যাংকের উদ্যোক্তায় ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান।
ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং বাজারে নতুন এক প্রতিযোগিতা তৈরি হতে যাচ্ছে। কারণ, নতুন ব্যাংকগুলোর কয়েকটির উদ্যোক্তাকে গ্রাহক সংগ্রহের কাজ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। বিকাশের এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধিত গ্রাহক ৮ কোটি ৩০ লাখের বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি এজেন্ট এবং ৯ লাখের বেশি মার্চেন্ট রয়েছে।
অন্যদিকে জুলাইয়ে রবির মোবাইল সংযোগ ছিল প্রায় ৫ কোটি ৮৮ লাখ এবং বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৮ লাখ। একই ব্যক্তির একাধিক সিম থাকতে পারে বলে এগুলোকে স্বতন্ত্র মানুষের সংখ্যা হিসেবে ধরা যাবে না। তারপরও এত বড় বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর জন্য বিপণন ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন হবে ৩০০ কোটি টাকা। তাদের নিজস্ব শাখা, উপশাখা, এজেন্ট বা এটিএম-সিডিএম থাকবে না। তবে প্রচলিত ব্যাংক, এমএফএস এবং বিদ্যমান এটিএম নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে। ডিজিটাল ব্যাংক আমানত নিতে, ভার্চ্যুয়াল কার্ড ও কিউআরভিত্তিক সেবা দিতে এবং ঋণ দিতে পারবে। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন এবং মাঝারি ও বড় শিল্পে ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এ কারণে বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি হবে আরও মৌলিক। বর্তমানে বিকাশ মূলত অর্থ স্থানান্তর ও পরিশোধের মাধ্যম; ব্যাংকের মতো নিজস্ব আমানত নিয়ে সেই অর্থ থেকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেলে আলাদা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান সেই সুযোগ পাবে।

লেনদেনের তথ্য থেকে ঋণ
ডিজিটাল ব্যাংকের বড় সম্ভাবনার একটি হচ্ছে প্রচলিত জামানতনির্ভর ঋণের বাইরে গ্রাহকের ডিজিটাল আর্থিক আচরণ ব্যবহার করে ঋণযোগ্যতা যাচাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘অলটারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং’ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে এর প্রয়োগ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সিটি ব্যাংক বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে জামানত ও কাগজপত্র ছাড়াই ক্ষুদ্র ডিজিটাল ঋণ দিচ্ছে। বিকাশ নিজেই গ্রাহকদের জানায়, নিয়মিত ব্যালান্স রাখা এবং পেমেন্ট, অ্যাড মানি, সঞ্চয়সহ বিভিন্ন সেবা বেশি ব্যবহার করলে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা তৈরির সম্ভাবনা বাড়ে।
জুলাই পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে সিটি ব্যাংকের এ ধরনের ঋণ নিয়েছেন ৩৫ লাখের বেশি গ্রাহক এবং মোট ঋণ বিতরণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ লেনদেনের ইতিহাস ও ডিজিটাল আচরণ ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার বাজার এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে।
একই গ্রুপে মোবাইল, পেমেন্ট ও ব্যাংক, ডেটার কী হবে
রবি ও বাংলালিংক-সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিংয়ে প্রবেশের কারণে নতুন একটি প্রশ্নও সামনে আসছে। টেলিকম অপারেটরের কাছে গ্রাহকের মোবাইল ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য থাকে; এমএফএস প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকে আর্থিক লেনদেনের তথ্য। আর ব্যাংকের কাছে থাকবে আমানত, ঋণ ও পরিশোধের তথ্য। আইনসম্মতভাবে এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে একজন গ্রাহকের আর্থিক আচরণ সম্পর্কে অনেক বিস্তারিত ধারণা তৈরি করা সম্ভব।
তবে একই মালিকানা বা গ্রুপে প্রতিষ্ঠান থাকলেই এসব তথ্য অবাধে এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটিতে নেওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়।
বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংক নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নতুন ডিজিটাল ব্যাংককে গ্রাহকের কেওয়াইসি নতুন করে করতে হবে। অন্য কোনো মাধ্যমে আগে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। গ্রাহকের তথ্য নির্ধারিত ব্যবসার বাইরে ব্যবহারও করা যাবে না। কী ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য কোন উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হবে।

এপ্রিল থেকে কার্যকর ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ মোবাইল নম্বর, আর্থিক তথ্য ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যকে ব্যক্তিগত উপাত্ত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যে উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে তা প্রকাশ করার ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা গোপনীয়তা ব্যবস্থাও প্রতি বছর বহিরাগত তথ্যপ্রযুক্তি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে হবে। ক্লাউড ব্যবহার করলে সেটির অবস্থান বাংলাদেশের মধ্যে রাখতে হবে।
প্রতিযোগিতা কোথায়
এখন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোর বড় অংশ শাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভৌত অবকাঠামোনির্ভর। বিপরীতে ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব শাখা বা এটিএম থাকবে না। ফলে অবকাঠামো পরিচালনার কিছু ব্যয় কমার সুযোগ রয়েছে। সেই সুবিধা কম ফি, বেশি আমানত সুদ কিংবা কম খরচের ক্ষুদ্র ঋণে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটিই হবে প্রতিযোগিতার অন্যতম মাপকাঠি।
একই সঙ্গে বিকাশ, রবি ও বাংলালিংক-সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের বিপুল বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি তাদের দ্রুত বড় হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সেই গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকের গ্রাহকে পরিণত করার সুযোগ নীতিমালায় নেই।
ফলে ডিজিটাল ব্যাংক চালু হওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাংকিং বাজার কতটা বদলাবে, তা শুধু নতুন অ্যাপ চালু হওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। গ্রাহকের আমানতের বিপরীতে কী সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, ক্ষুদ্র ঋণের মূল্য কত, প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় সেবা কতটা সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে গ্রাহকের বিপুল ডিজিটাল তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, ভাগ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরই নতুন এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় পরীক্ষা হবে।
নবোদয়/ এসএন/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬