Loading...

রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা
এখন সেই চিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর বর্জ্যকে আর শুধু ফেলে দেওয়ার উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে শিল্প প্রোটিন পাউডার ও জেলটিনের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি সমস্যা এভাবেই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে নতুন শিল্প সম্ভাবনায়।


চামড়া শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘ সম্পর্ক। কিন্তু এই শিল্পের আরেকটি দিক দীর্ঘদিন ধরেই ছিল পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ট্যানারি থেকে বের হওয়া বর্জ্য, চামড়ার ছাঁট ও রাসায়নিকযুক্ত নানা উপাদান ব্যবস্থাপনার অভাবে জমে থাকত, তৈরি করত দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। অর্থাৎ, যে শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আনে, তার বর্জ্যই আবার পরিবেশের ওপর তৈরি করত বাড়তি চাপ।
এখন সেই চিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর বর্জ্যকে আর শুধু ফেলে দেওয়ার উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে শিল্প প্রোটিন পাউডার ও জেলটিনের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি সমস্যা এভাবেই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে নতুন শিল্প সম্ভাবনায়।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে চীনের ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপের বিনিয়োগ। বাংলাদেশে দুটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে তারা ট্যানারি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় গত বছর থেকে রপ্তানির জন্য উৎপাদন শুরু হয়েছে।
এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি চীন, কম্বোডিয়া ও অন্যান্য দেশে প্রায় ১৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ ডলারের জেলটিন এবং ৩ লাখ ডলারের প্রোটিন পাউডার রয়েছে। সম্প্রতি হংকং থেকেও ৪ লাখ ডলারের জেলটিনের ক্রয়াদেশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কাগজপত্র সম্পন্ন হলে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পণ্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কাছে থাকা বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন ও ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি নামের দুটি প্রতিষ্ঠানে এই কার্যক্রম চলছে। বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন ট্যানারি বর্জ্য সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। উৎপাদিত প্রোটিন পাউডার মূলত চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয়। আর জেলটিনের অন্যতম ব্যবহার ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে।

এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জেলটিন ও সংশ্লিষ্ট কিছু পণ্য এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৫ লাখ ডলারের জেলটিন এবং প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ডলারের ক্যাপসুলের আবরণ আমদানি করেছে। অর্থাৎ দেশে কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও তার একটি অংশ এখনো আমদানিনির্ভর।
কারখানাগুলোর বার্ষিক জেলটিন উৎপাদনের সক্ষমতা ৫ হাজার টন। এই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে বছরে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ডলারের সমপরিমাণ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য থেকে জানা যায়। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান। কোম্পানিটির দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
তবে সম্ভাবনার সঙ্গে এসেছে বড় একটি সংকটও। জেলটিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গরুর চামড়ার ছাঁটের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রতিষ্ঠানটি। তাদের হিসাবে, বছরে ৫ হাজার টন জেলটিন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রায় ৩০ হাজার টন চামড়ার ছাঁট প্রয়োজন। অথচ দেশে বছরে এ ধরনের ছাঁট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার টন।
এর মধ্যে দেশ থেকে কাঁচা চামড়ার ছাঁট রপ্তানি শুরু হওয়ায় স্থানীয় কারখানাগুলোর কাঁচামাল সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা। এ কারণে সরকারের কাছে চামড়ার ছাঁট রপ্তানি বন্ধ এবং দেশীয় শিল্পের জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এখানে পরিবেশের পাশাপাশি শিল্পনীতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করে যদি রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করা যায়, একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমানো ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কেবল পরিবেশগত দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে শিল্পের একটি সম্ভাবনাময় অংশ।
বাংলাদেশের জেলটিন ও ক্যাপসুল-সম্পর্কিত রপ্তানি এখনো খুব ছোট। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সাতটি দেশে খালি জেলটিন ক্যাপসুল রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ডলারের। তবে বৈশ্বিক বাজার বাড়ছে। ২০২৫ সালে খালি ক্যাপসুলের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩১৯ কোটি ডলার, যা ২০৩০ সালে ৪১৯ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বাজার গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে।
তাই সাভারের ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি হওয়া কয়েক লাখ ডলারের রপ্তানি এখনো বড় কোনো সাফল্যের হিসাব নয়। তবে এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। দীর্ঘদিনের পরিবেশগত বোঝাকে যদি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সঠিক নীতির মাধ্যমে শিল্পের কাঁচামালে পরিণত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের চামড়া খাতের পরিচিত গল্পটিও বদলাতে পারে। বর্জ্য তখন আর শুধু ফেলার জিনিস থাকবে না, হয়ে উঠতে পারে নতুন রপ্তানি ও শিল্প সম্ভাবনার কাঁচামাল।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬