Loading...

বিকল্প এলএনজি মিললেও খরচ বাড়বে
বাংলাদেশে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাচ্ছে না, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের কারণে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না কাতারএনার্জি।


বাংলাদেশে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের কারণে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না কাতার এনার্জি।
এতে বাংলাদেশের সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কাতারের ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, বিদ্যুৎ ও শিল্পে এর প্রভাব কতটা পড়বে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সংকটটি নভেম্বরের পরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানিতে কাতারের ভূমিকা বড়। ২০২৫ সালে দেশের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছিল কাতার থেকে। চলতি বছর কাতারএনার্জির কাছ থেকে প্রায় ৪০টি কার্গো পাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সরবরাহের বড় অংশ ব্যাহত হতে পারে।
এমন সময়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে, যখন দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনও কমছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিমের হিসাবে, এক দশক আগে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। ফলে ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
আগে চাপ পড়বে বিদ্যুৎ ও শিল্পে
গ্যাস সরবরাহ আরও কমলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও সার উৎপাদনের মধ্যে গ্যাস বণ্টনের চাপ বাড়বে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমতে পারে। তখন বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক কেন্দ্র বেশি চালানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা গ্যাসভিত্তিক উৎপাদনের তুলনায় ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে শিল্পে গ্যাস কমলে টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশের গ্যাসসংকট এখন কয়েক বছরের পুরোনো কাঠামোগত সমস্যা। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি সক্ষমতার ওপর পড়ছে। শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিকল্প এলএনজি মিললেও খরচ বাড়বে
কাতারের সরবরাহ না এলে বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত বিকল্প হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর এশিয়ার বাজারে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কিনতে সাধারণত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এই বাড়তি খরচ সরাসরি সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করে। চলতি অর্থবছরে এলএনজির জন্য নির্ধারিত ভর্তুকির তুলনায় প্রকৃত ব্যয় অনেক বেড়েছে। অর্থাৎ এলএনজি পাওয়া গেলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কত দামে পাওয়া যাবে এবং দীর্ঘ সময় সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে কি না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, আমদানি করা এলএনজির উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি। প্রয়োজনীয় সব এলএনজি কিনতে গেলে সরকারের ব্যয় বাড়ে, আবার পুরো ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপানোও সহজ নয়।
শীতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে
সামনের শীত বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ঝুঁকি। শীতকালে ইউরোপে ঘর গরম রাখতে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। একই সময়ে কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা সীমিত স্পট মার্কেটে একই কার্গোর জন্য প্রতিযোগিতা করবে। এতে দাম বাড়ার পাশাপাশি কার্গো পাওয়া কঠিনও হতে পারে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ফ্রান্সের টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে নয় মাসে ১৮টি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো উৎসও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগ কাতারের পুরো ঘাটতি পূরণ করতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নভেম্বরেই কি সংকট শেষ হবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
কাতারএনার্জির বর্তমান সরবরাহ স্থগিতাদেশ নভেম্বর পর্যন্ত হলেও নভেম্বরের পরই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বাংলাদেশকে জানিয়েছে, চলতি বছরের পরিকল্পিত সরবরাহের বড় অংশ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে এবং কম সরবরাহের পরিস্থিতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।
কাতারের রপ্তানি সক্ষমতাও বড় ধাক্কা খেয়েছে। আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির এলএনজি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে যায়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কাতার-সংশ্লিষ্ট কিছু এলএনজি জাহাজ আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল শুরু করেছে, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা স্পষ্ট। অধ্যাপক এম তামিম ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এলএনজি দেশীয় গ্যাসের বিকল্প হতে পারে না।
স্থানীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহবিঘ্নের ধাক্কা বাংলাদেশকে বারবার সামলাতে হবে। তাই কাতারের এলএনজি সংকট আপাতত নভেম্বর পর্যন্ত হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি ঝুঁকি তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬