Loading...

নরসিংদীতে জার্মান গবেষক দল: উঁচু জমি, কম পানি, টিকে থাকার লড়াই
এত দিন যে তথ্যগুলো প্রত্নবস্তু ও খননের মাধ্যমে দেখা হতো, এবার সেগুলোকে পরিবেশের সঙ্গে সংখ্যার হিসাবে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ একটি পুরোনো রাস্তা কোথায় পাওয়া গেছে কিংবা একটি বসতির ধ্বংসাবশেষ কোথায় রয়েছে শুধু সেই তথ্য নয়; সেই জায়গার মাটি, উচ্চতা, পানি ও ভূপ্রকৃতিও বিশ্লেষণে ধরা হয়েছে।


আজ একটি গ্রামে বাড়ি বানানোর আগে মানুষ দেখে জমি উঁচু কিনা। বর্ষায় পানি জমে কিনা। আশপাশের খাল বা নদীর অবস্থা কেমন। দুই হাজার বছর আগেও মানুষ বসতি গড়ার সময় এমন কিছু বিষয় হিসাব করত, এমন ইঙ্গিত মিলেছে নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর থেকে।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, আদি ঐতিহাসিক যুগের এই অঞ্চলের প্রাচীন বসতিগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিল না। তুলনামূলক উঁচু, পানি দ্রুত নেমে যায় এমন এবং পরিবেশগতভাবে স্থিতিশীল জায়গায় বসতি গড়ে ওঠার প্রবণতা ছিল বেশি। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগে মানুষও বসবাসের জন্য এমন ভূখণ্ড বেছে নিয়েছিল, যেখানে টিকে থাকা কিছুটা সহজ।
জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক ইনস্টিটিউট ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নতুন গবেষণাটি নিয়ে প্রকাশ করেছে। গবেষণাটির নাম Modelling Human–Environment Relationships in Early Historic Wari-Bateshwar: A GIS and Regression-based Approach।
গবেষক মিলন বকশী ও লামিয়া ইসলাম নাবিলা উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর অবস্থানকে এলাকার ভূমির উচ্চতা, পানি জমার প্রবণতা, নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। এ জন্য তাঁরা ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করেছেন।

গবেষণার জন্য পুরো এলাকাকে অনেক ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রতিটি অংশের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা হয়েছে। এরপর দেখা হয়েছে, কোন ধরনের জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক বসতির চিহ্ন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় ভূমির উচ্চতা এবং আশপাশের ভূখণ্ড কতটা উঁচু এই দুই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রাচীন বসতির ঘনত্বের শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সহজ করে বললে, জায়গা যত উঁচু, সেখানে প্রাচীন বসতি পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি ছিল। অন্যদিকে যেসব জায়গায় পানি জমে থাকার সম্ভাবনা বেশি, সেখানে বসতির ঘনত্ব কম ছিল।
এটি উয়ারী-বটেশ্বরের ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গেও মেলে। প্রত্নস্থলটি নরসিংদীর বেলাব উপজেলার উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রামে, একটি তুলনামূলক উঁচু প্রাচীন ভূমিখণ্ডে অবস্থিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো ব্রহ্মপুত্র ও আড়িয়াল খাঁ নদীর কাছাকাছি এই অঞ্চলে একসময় নদীর প্রবাহ ও জলাভূমির প্রভাব ছিল, আবার বসতিগুলোর অংশ ছিল উঁচু গৈরিক মাটির ভূখণ্ডে। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এখানে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো স্থাপনা ও নানা প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে।

উয়ারী-বটেশ্বরকে নিয়ে এর আগের গবেষণাতেও প্রাচীন নগরজীবনের নানা চিহ্ন পাওয়া গেছে। দুর্গপ্রাচীর, রাস্তা, বন্দরসদৃশ কাঠামো, মুদ্রা, পুঁতি ও লোহার বিভিন্ন সামগ্রী থেকে ধারণা করা হয়েছে, এটি শুধু সাধারণ গ্রাম্য বসতি ছিল না; বরং আদি ঐতিহাসিক সময়ে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও নগরকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এই অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে মানুষের বসবাসের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
নতুন গবেষণার বিশেষত্ব হলো, এত দিন যে তথ্যগুলো প্রত্নবস্তু ও খননের মাধ্যমে দেখা হতো, এবার সেগুলোকে পরিবেশের সঙ্গে সংখ্যার হিসাবে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ একটি পুরোনো রাস্তা কোথায় পাওয়া গেছে কিংবা একটি বসতির ধ্বংসাবশেষ কোথায় রয়েছে শুধু সেই তথ্য নয়; সেই জায়গার মাটি, উচ্চতা, পানি ও ভূপ্রকৃতিও বিশ্লেষণে ধরা হয়েছে। ফলে প্রাচীন মানুষ কীভাবে তাদের চারপাশের পরিবেশকে ব্যবহার করত, তার একটি বড় ছবিও তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, উঁচু জায়গার প্রতি এই ঝোঁকের কারণ কী ছিল? সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা হলো পানি। নদী ও বন্যার প্রভাব থাকা ভূখণ্ডে একটু উঁচু জায়গা মানে বর্ষায় তুলনামূলক কম জলাবদ্ধতা, বাড়িঘর টিকিয়ে রাখার সুবিধা এবং যাতায়াতের জন্য কিছুটা স্থিতিশীল ভূমি। কৃষি, বসতি ও বাণিজ্য—তিন ক্ষেত্রেই এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষণার ফলও দেখাচ্ছে, যেখানে পানি আটকে থাকার প্রবণতা বেশি, সেখানে বসতি কম গড়ে উঠেছে। তবে ঠিক কোন কারণে প্রতিটি নির্দিষ্ট বসতি ওই জায়গাটিই বেছে নিয়েছিল, তা শুধু এই মডেল দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। গবেষণাটি মূলত পরিবেশ ও বসতির অবস্থানের সম্পর্ক দেখিয়েছে।

এখানেই আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় যোগ তৈরি হয়। বর্তমানে নদীভাঙন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে মানুষের বসতি কোথায় হচ্ছে, এটি নিয়ে নিয়মিত পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু উয়ারী-বটেশ্বরের প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো ভূদৃশ্য দেখাচ্ছে, মানুষের বসতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের এই সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং নদী ও পানির সঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ বহু আগেই ভূমির উচ্চতা ও স্থিতিশীলতার গুরুত্ব বুঝে নিয়েছিল।
বর্তমান ভূপ্রকৃতি পুরোপুরি তখনকার মতো নেই, তাই আজকের বন্যার মানচিত্র সরাসরি দুই হাজার বছর আগের সঙ্গে মিলিয়ে একই সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। কিন্তু বসতির অবস্থান যে পরিবেশের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, নতুন গবেষণাটি তার পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রমাণ দিয়েছে।
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গবেষকেরা তাঁদের ব্যবহৃত তথ্য ও বিশ্লেষণের সহায়ক উপাত্তও প্রকাশ করেছেন। উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের অবস্থান, সময়কাল ও প্রত্নবস্তুর তথ্যসহ একটি পরিপূরক তথ্যভান্ডার উন্মুক্ত করা হয়েছে। এমনকি গবেষণায় ব্যবহৃত ভৌগোলিক বিশ্লেষণের জন্য একটি ইন্টার্যাক্টিভ ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনও দেওয়া হয়েছে। ফলে গবেষণার ফল শুধু একটি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ভবিষ্যতে অন্য গবেষকেরাও একই তথ্য ব্যবহার করে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারবেন।
উয়ারী-বটেশ্বর তাই শুধু পুরোনো মুদ্রা, দুর্গ কিংবা রাস্তার ধ্বংসাবশেষের নাম নয়। এর মাটিতে লুকিয়ে আছে মানুষ কীভাবে নদী, পানি ও ভূমির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বসতি গড়ে তুলেছিল, তারও গল্প। দুই হাজার বছর আগের মানুষ স্যাটেলাইট ছবি কিংবা আধুনিক মানচিত্র দেখেনি। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া বসতির অবস্থান আজকের বিজ্ঞানকে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিচ্ছে। টিকে থাকার জন্য মানুষের জায়গা বেছে নেওয়ার বুদ্ধি যতটা আধুনিক বলে আমরা ভাবি, তার শিকড় ততটাই পুরোনো।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬