Loading...

দালালের ফাঁদে বাংলাদেশি তরুণ
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসীরা গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজি, পাচার এবং দীর্ঘমেয়াদি আটকের মতো নানা ঝুঁকির মুখে পড়েন। বিশেষ করে পাচারকারী চক্রের হাতে পড়লে অভিবাসীদের ওপর অর্থ আদায়ের জন্য নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।


ইউরোপে একটি ভালো চাকরি, পরিবারের ঋণ শোধ, স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন—এই আশাতেই ২০২২ সালে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার উজ্জ্বল হোসেন তার ছোট ভাই মো. আরিফুল ইসলামকে ইতালি পাঠানোর উদ্যোগ নেন। স্থানীয় দালাল সেলিম রেজা তাকে মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেন। ইতালি যাওয়ার জন্য চাওয়া হয়েছিল ১০ লাখ টাকা। উজ্জ্বল দেন ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
বিমানে ওঠার সময় আরিফুলের চোখে ছিল ইউরোপের নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু লিবিয়ার বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর সেই স্বপ্ন পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
সেলিম রেজা ও তার সহযোগীরা আরিফুলকে একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। জানালাবিহীন একটি কক্ষে আটকে রেখে চলে নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও মিলত পাচারকারীদের উপস্থিতিতে। আরিফুল তখন ভাইকে বলেছিলেন, ‘ওরা যা চায়, দিয়ে দাও, না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’
ভাইকে বাঁচাতে উজ্জ্বল পৈত্রিক জমি বিক্রি করেন। ঋণ নেন। ১০ লাখ টাকা তুলে দেন পাচারকারীদের হাতে। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি পরিবারের সর্বনাশ।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর এবার উজ্জ্বলের বাবা মো. ইজাল উদ্দিনকে অপহরণ করা হয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে লিবিয়ায় কাজ করা ইজালকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে আরও ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তিনি জানান, সেলিম তাকে এমনভাবে মারধর করেন যে ওপরের পাটির দুটি দাঁত ভেঙে যায়।
শেষ পর্যন্ত আরও ৫ লাখ টাকা দিয়ে অন্য একটি চক্রের সহায়তায় ২০২৩ সালের শেষ দিকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছান আরিফুল। ইউরোপে পৌঁছালেও পরিবারের জন্য স্বপ্নের সেই যাত্রার শেষ হয়েছে জমি বিক্রি, ঋণ, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তায়।
উজ্জ্বলের পরিবার এখনো ঋণের বোঝা বইছে। প্রতি মাসে মহাজনদের ১ থেকে দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়। তার ভাষায়, ‘আমাদের পরিবার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।’
আরিফেুলের পরিবারের কাছে ইউরোপ ছিল নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি। শেষ পর্যন্ত সেই পথই কেড়ে নিয়েছে তাদের জমি, সঞ্চয়, নিরাপত্তা এবং বহু বছরের স্বপ্ন।

এক পরিবারের গল্প, বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি
আরিফুলের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথে বাংলাদেশিদের বড় উপস্থিতিই পাচার ও শোষণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের মার্চ-এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে লিবিয়ায় প্রায় ২৩ হাজার ১১৮ বাংলাদেশি অভিবাসীর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। তাদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন বেনগাজি, মিসরাতা ও ত্রিপোলি অঞ্চলে। আইওএম বলছে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের ৯২ শতাংশ আকাশপথে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন।
ইউরোপে পৌঁছানোর পরিসংখ্যানও এই প্রবাহের ব্যাপ্তি দেখায়। আইওএমের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র ও স্থলপথ মিলিয়ে ওই বছর ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছান। তাদের ৮৩ শতাংশ ইতালি এবং ১৬ শতাংশ গ্রিসে পৌঁছান। আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশি আগমনের সংখ্যা বেড়েছিল ৫৯ শতাংশ।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪৯ বাংলাদেশি ইতালি এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন গ্রিসে পৌঁছেছেন। একই সংস্থার হিসাবে, গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।
ফিরে আসা অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা অভিবাসীদের ৭৫ শতাংশ লিবিয়ায় প্রতিশ্রুত কাজ পাননি। ৯৩ শতাংশকে কোনো না কোনো সময় ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৬৯ শতাংশ তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছিলেন।
লিবিয়ায় আটকে পড়াই বড় বিপদ
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক অভিবাসীর দুর্ভোগ শুরু হয়। কাজের প্রতিশ্রুতি বদলে যায় আটকে রাখা, মুক্তিপণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক শ্রমে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসীরা গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজি, পাচার এবং দীর্ঘমেয়াদি আটকের মতো নানা ঝুঁকির মুখে পড়েন। বিশেষ করে পাচারকারী চক্রের হাতে পড়লে অভিবাসীদের ওপর অর্থ আদায়ের জন্য নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।
আরিফুল ও তার বাবার ঘটনা সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। তাদের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা আদায় করা হয়েছে। একটি পরিবারের দুই সদস্যকে ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একই পাচারকারী চক্র।
সমুদ্রের শেষ প্রান্তেও অপেক্ষা মৃত্যু
লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার শেষ ধাপ ভূমধ্যসাগর। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। নৌযানডুবি, অতিরিক্ত যাত্রী এবং সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতি এই রুটে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ইউএনএইচসিআরের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভূমধ্যসাগরজুড়ে ১ হাজার ২৩৯ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ৮২৪ জন ছিলেন মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে। একই সময়ে ইতালিতে সমুদ্রপথে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিল সবচেয়ে বড় জাতীয় গোষ্ঠী।
অর্থাৎ লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরও বিপদ শেষ হয় না। বরং শুরু হয় আরও একটি অনিশ্চিত অধ্যায়—সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর লড়াই।

মামলা আছে, বিচার কতটা এগোয়?
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি ভুক্তভোগীদের জন্য আরেক দুর্ভোগ তৈরি করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে ৫ হাজার ২৮৪টি মানবপাচার মামলা অনিষ্পন্ন ছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি মামলা।
দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং ভুক্তভোগীদের মামলা থেকে সরে যাওয়া বা আপসের কারণে অনেক মামলা শেষ পর্যন্ত খালাসে গড়ায়।
এদিকে ২০২৫ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মানবপাচার মামলায় আইন প্রয়োগ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট আদালত ও ট্রাইব্যুনাল ওই সময় ১০৩ জন পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
স্বপ্নের দাম যখন জমি, ঋণ আর জীবন
আরিফুল এখন ইতালিতে। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানো মানেই পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তার পরিবার হারিয়েছে জমি, সঞ্চয় ও নিরাপত্তা; মাথায় উঠেছে বিপুল ঋণ। বাবা ফিরেছেন নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে। আর ভাইকে ইউরোপে পাঠানোর যে স্বপ্ন ছিল, তা পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক ও মানসিক সংকটে।
উজ্জ্বলের পরিবারের গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের কাহিনি নয়। এটি দেখায়, ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করে কীভাবে দালালচক্র অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করে, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয় এবং লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একের পর এক বিপদের মুখে ফেলে।
নবোদয়/ কেএ/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬