Loading...

দুর্বল প্রস্তুতি, পাওনা পরিশোধে বিলম্ব ও ফেডারেশনে অনিয়ম
বড় আসরের আগে প্রত্যাশা, শেষে হতাশার হিসাব—বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই চক্র কাটছে না। এশিয়ান গেমসে একটিমাত্র ব্রোঞ্জ আবারও সামনে এনেছে প্রস্তুতির ঘাটতি ও খেলোয়াড় তৈরির দুর্বলতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রিকেটে বিশ্বকাপের মঞ্চ হারানো, নারী ফুটবলে কোচ–খেলোয়াড় দ্বন্দ্ব, পারিশ্রমিক ও পুরস্কারের অর্থ পেতে বিলম্ব এবং ক্রীড়াসংস্থার পরিচালনায় অনিয়ম। মাঠের ব্যর্থতা মূল্যায়নে তাই ফলাফলের পাশাপাশি এসব সমস্যাও বিবেচনায় আসছে।


বড় আসরের আগে প্রত্যাশা, শেষে হতাশার হিসাব—বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই চক্র কাটছে না। এশিয়ান গেমসে একটিমাত্র ব্রোঞ্জ আবারও সামনে এনেছে প্রস্তুতির ঘাটতি ও খেলোয়াড় তৈরির দুর্বলতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রিকেটে বিশ্বকাপের মঞ্চ হারানো, নারী ফুটবলে কোচ–খেলোয়াড় দ্বন্দ্ব, পারিশ্রমিক ও পুরস্কারের অর্থ পেতে বিলম্ব এবং ক্রীড়াসংস্থার পরিচালনায় অনিয়ম। মাঠের ব্যর্থতা মূল্যায়নে তাই ফলাফলের পাশাপাশি এসব সমস্যাও বিবেচনায় আসছে।
রবিবার শেষ হওয়া আইচি–নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ২২ ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের ১৮৭ ক্রীড়াবিদ অংশ নেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাবে সফরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। অথচ প্রাপ্তি একটি ব্রোঞ্জ। ২০২৩ সালের আগের আসরে ক্রিকেট থেকে এসেছিল দুটি ব্রোঞ্জ। এবার সেই দুই দলও পদক পায়নি। পাকিস্তান ১০, শ্রীলঙ্কা তিন ও নেপাল দুটি পদক নিয়ে ফিরেছে। বাংলাদেশের বড় বহর ও সীমিত অর্জনের এই ব্যবধান নির্বাচন ও প্রস্তুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
একমাত্র পদকজয়ী উশুর জিন্নাত আক্তার প্রথম রাউন্ডে বাই পান। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ নির্ধারিত ওজন বজায় রাখতে না পারায় সেমিফাইনালে উঠে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন তিনি। সেমিফাইনালে চীনা প্রতিপক্ষের কাছে হারলেও নিয়ম অনুযায়ী পদক পান। চার দশক পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে এই অর্জনের পর জিন্নাত বছরব্যাপী অনুশীলনের নিজস্ব ভেন্যু ও বিদেশি কোচের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। তার বক্তব্যেই উঠে এসেছে নিয়মিত প্রস্তুতির ঘাটতি।
এই ঘাটতি আরও স্পষ্ট অন্য খেলায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফুটবল, ক্রিকেট ও আর্চারি ছাড়া অন্যান্য ডিসিপ্লিনের গেমস প্রস্তুতি ছিল এক মাসের কম। কাবাডিতে দক্ষিণ কোরিয়া ও চাইনিজ তাইপেকে হারিয়েও জাপানের কাছে হেরে পদক হারিয়েছে বাংলাদেশ। শুটিং–আর্চারিতেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সাঁতারে মুক্তি খাতুন নিজের সেরা সময়ও করতে পারেননি। ব্যাডমিন্টনে আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে জার্সির অমিল দূর করতে খেলোয়াড়কেই বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়েছে। প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে এমন ব্যবস্থাপনার ত্রুটি বড় আসরের প্রস্তুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ক্রিকেটে ব্যর্থতার মাত্রা আলাদা, কারণ এই খেলায় অর্থ ও অবকাঠামো তুলনামূলক বেশি। এশিয়ান গেমসে পুরুষ দল পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে পদকহীন হয়েছে। নারী দলও ব্রোঞ্জের ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হেরেছে। বছরের শুরুতেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকেও বাদ পড়ে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা উদ্বেগে ভারতের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানোর দাবি করেছিল বিসিবি। আইসিসি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে; তাদের মূল্যায়নে যাচাইযোগ্য নিরাপত্তাঝুঁকি ছিল না। নির্ধারিত সূচিতে অংশগ্রহণে বিসিবি সম্মত না হওয়ায় ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়। ভেন্যু নিয়ে বিরোধের পরিণতিতে বিশ্বকাপের মঞ্চ হারায় বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুযোগ হারানোর পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটের পেশাদার কাঠামোও প্রশ্নের মুখে। সর্বশেষ বিপিএল শুরুর আগের দিন চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিকপক্ষ সরে দাঁড়ালে দল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয় বিসিবিকে। খেলোয়াড়দের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে। ২৩ জানুয়ারি আসর শেষ হওয়ার পরও বকেয়া পারিশ্রমিকের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। ২৭ জানুয়ারি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে পাওনা মেটানোর নির্দেশ দেয় বিপিএল কর্তৃপক্ষ। টুর্নামেন্ট শেষ হলেও চুক্তির আর্থিক শর্ত বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির ঘাটতি দেখা যাচ্ছে পুরুষ দলের ফলেও। মার্চে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে সিঙ্গাপুরের কাছে শেষ ম্যাচে ১–০ গোলে হেরে ছয় ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে অভিযান শেষ করে বাংলাদেশ। নারী দলের সাফ জয় ও প্রথম এশিয়ান কাপে অংশগ্রহণ অর্জন হলেও এশীয় পর্যায়ের ব্যবধান রয়ে গেছে। এশিয়ান গেমসে উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০–০ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬–০ গোলে হার সেই ব্যবধান সামনে এনেছে।
এই ব্যবধান কমাতে বাড়তি প্রস্তুতি দরকার হলেও নারী ফুটবলে বারবার আলোচনায় এসেছে কর্মপরিবেশ ও পাওনার সমস্যা। ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তার অধীনে অনুশীলন বর্জনের ঘোষণা দেন একদল ফুটবলার। পরে তাদের চুক্তি নবায়ন হয়; তবে সে সময় অনুশীলনে বিঘ্ন ঘটেছিল।

২০২৪ সালের সাফ জয়ের পর ঘোষিত পুরস্কারের অর্থ খেলোয়াড়েরা হাতে পান চলতি বছরের ৭ জুন, ঘোষণার দেড় বছরের বেশি পরে। আবার ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে নারী লিগ শেষের ছয় মাস পরও ম্যাচসেরা খেলোয়াড়দের অনেকের ১০ হাজার টাকা করে পুরস্কার না পাওয়ার অভিযোগ আসে। সে সময় বাফুফের পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
পাওনা পরিশোধের এসব বিলম্বের সঙ্গে ক্রীড়াসংস্থার আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও যুক্ত। ২০২৪ সালের মে মাসে ফিফার অর্থের লেনদেনে জাল নথি এবং তদারকির ব্যর্থতার ঘটনায় বাফুফের পাঁচ তৎকালীন ও সাবেক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন শাস্তি দেয় ফিফা। ক্রিকেটেও ২০২৫ সালের নির্বাচনে অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বিসিবির নির্বাচিত পর্ষদ ভেঙে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ফলে পরিচালনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও শাস্তির মধ্য দিয়েও।
এশিয়ান গেমসের হতাশার পর ৪ অক্টোবর অংশ নেওয়া ফেডারেশনগুলোর পারফরম্যান্স মূল্যায়নে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ ও সম্ভাবনাময় খেলায় গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। এখন সেই মূল্যায়নের সামনে রয়েছে একাধিক প্রশ্ন- বড় বহরের জন্য ব্যয়ের পাশাপাশি প্রস্তুতিতে কত বিনিয়োগ হয়েছে, খেলোয়াড়েরা সময়মতো পাওনা পেয়েছেন কি না এবং ফেডারেশনগুলো নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করেছে। মাঠের ফল বদলানোর পরিকল্পনায় এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
নবোদয়/ এসএন/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬