Loading...

৮১তম অধিবেশন
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই আসরে তার প্রথম ভাষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান।


বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই আসরে তার প্রথম ভাষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে ফের প্রত্যাবাসনের দাবি
ভাষণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সংকট হিসেবে উঠে আসে রোহিঙ্গা ইস্যু। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, ফলে এর সমাধানও সেখানেই হতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। দীর্ঘায়িত সংকটের সঙ্গে মানবিক সহায়তার ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও তাই ভাষণে সামনে এসেছে।
জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে অর্থায়নের প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি বড় অংশ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতায় শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন সহায়তা এবং অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে এসব বিষয়ে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান তিনি।
দেশের ভেতরে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া এবং বন্যা ও খরার প্রভাব মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও ভাষণে তুলে ধরা হয়। আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধানের আহ্বান
রোহিঙ্গা ও জলবায়ুর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং বিশ্বশান্তির প্রশ্নও ভাষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও মানবসৃষ্ট সংঘাত শুধু প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি ঘটাচ্ছে না, বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও চাপে ফেলছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যা আরও তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হিসেবে তিনি সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে কথা বলেন। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রগুলোর মর্যাদার প্রতি সম্মানকে ভিত্তি করার আহ্বান জানান। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির কথা বলেন।
ভাষণটির তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক বার্তা স্পষ্ট। প্রথমত, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের মানবিক বোঝা নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব হিসেবেও সামনে রাখা। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনে কম দায়ী কিন্তু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অর্থায়ন ও ন্যায়সংগত সহায়তার দাবি। তৃতীয়ত, সামরিক শক্তি ও সংঘাতের বিপরীতে সংলাপ, বহুপক্ষীয়তা এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান।
ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি এমন তিনটি বৈশ্বিক সংকটই সামনে এসেছে, যেগুলোর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।
নবোদয়/ কেএ/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬