Loading...

আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্ন
বাড়ি দখলে সশস্ত্র হামলা, আসামি ধরতে গেলে পুলিশের ওপর আক্রমণ, আবার হাতকড়াসহ আসামি ছিনিয়ে নেওয়া—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। অপরাধী চক্র আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকেও বাধা দেওয়ার সাহস পাচ্ছে কীভাবে।


বাড়ি দখলে সশস্ত্র হামলা, আসামি ধরতে গেলে পুলিশের ওপর আক্রমণ, আবার হাতকড়াসহ আসামি ছিনিয়ে নেওয়া—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। অপরাধী চক্র আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকেও বাধা দেওয়ার সাহস পাচ্ছে কীভাবে।
ঘটনাগুলো ভিন্ন এলাকায় ঘটলেও জমি, চাঁদা ও মাদকের লাভজনক নিয়ন্ত্রণের লড়াই সামনে আসছে। সরকারের দায়িত্ব শুধু হামলার পরে গ্রেপ্তার করা নয়; পরিচিত চক্রের তৎপরতা ঠেকানো এবং বিপদে পড়া নাগরিকের ডাকে সময়মতো সাড়া দেওয়াও।
ঢাকার আদাবরে শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি বাড়ির মালিকানা নিয়ে আদালতে বিরোধ চলছে। ২৬ সেপ্টেম্বর সেখানে অস্ত্রধারীরা হামলা ও ভাঙচুর করেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় মার্চে বাড়িটির দখল ফিরে পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার হামলা হলো। মামলার আসামিদের ধরতে সোমবার দিবাগত রাতে নবোদয় হাউজিংয়ে গেলে কয়েকজন চাপাতি নিয়ে হামলার চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ সময় পুলিশের গুলিতে দুজন আহত হন। ওই অভিযানে চারজনসহ মামলায় মোট ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার সময় ৯৯৯-এ ফোন করেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি তারা।
আদাবরের বাইরেও পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীতে পাঁচ মামলায় পরোয়ানাভুক্ত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে পাথর ছুড়ে হাতকড়াসহ তাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এক পুলিশ সদস্য আহত হন। ২২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গ্রেপ্তার তিনজনকে থানায় নেওয়ার পথে পুলিশের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে।
সেখান থেকে দুজনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চার পুলিশ সদস্য আহত হন। একই দিন নড়াইলে অস্ত্র ও মাদক মামলায় পরোয়ানাভুক্ত আরেক আসামিকে পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ ছাড়িয়ে নেওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তিন জায়গাতেই গ্রেপ্তারের পর আসামিকে নিরাপদে থানায় নেওয়ার সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

অপরাধের আর্থিক প্রণোদনা মিরপুরের অভিযোগগুলোতে স্পষ্ট। এক আবাসন ব্যবসায়ী গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, গত এপ্রিলে তার প্রায় ২৮ কাঠা জমির সীমানাপ্রাচীর ও ঘর বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দখলে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বিদেশে থাকা মফিজুর রহমান মামুনের নামে পরিচিত একটি চক্র এবং দেশে থাকা তার দুই ভাই। মামুন স্থানীয় ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।
আরেক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানেও মিরপুরে জমি, পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা, চাঁদা ও মাদক ঘিরে বিদেশ থেকে পরিচালিত বাহিনীর কথা এসেছে। ২০২১ সালে তাকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ জানিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় ২৭টি মামলা ও ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্য রয়েছে। মামুনের ভাই মশিউর রহমান গণমাধ্যমে চাঁদাবাজিসহ অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
সন্ত্রাসীরা ঝুঁকি নিচ্ছে কেন? চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, অপরাধের লাভ বেশি এবং ধরা পড়া ও শাস্তির আশঙ্কা কম মনে হলে অপরাধে জড়ানোর প্রণোদনা বাড়ে।
তার মতে, রাজনৈতিক আশ্রয়, তদন্ত ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, পুনরায় অপরাধের সুযোগ এবং অস্ত্রের প্রাপ্যতা চক্রগুলোকে টিকিয়ে রাখে। তবে জামিন পাওয়াকে নিজে অপরাধ বা বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা বলা চলে না। রাষ্ট্রের কাজ নির্দিষ্ট মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীর সুরক্ষা ও আইনসম্মত নজরদারি নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, অপরাধের আয় থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়দাতারা সুবিধা পেলে শুধু অভিযান চালিয়ে চক্র ভাঙা যাবে না।

অস্ত্রের উৎসও সরকারের তদন্তের বিষয়। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪ সালে থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৬৬টি অস্ত্র তখনো উদ্ধার হয়নি। এরপর গত আগস্টে সরকার লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ ইউনিট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
সরকারি গাফিলতির প্রশ্নে অন্তত একটি ঘটনায় সরাসরি স্বীকারোক্তি এসেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শাহ আলী থানার ওসির দায়িত্বে অবহেলা ছিল। তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে; বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে সরকার।
একই মন্ত্রী সংসদে পুলিশের মনোবল ফেরানো ও অপরাধ দমনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকারও করেন।
গ্রেপ্তার ও সরকারি অঙ্গীকার আছে। কিন্তু পরিচিত চক্রের বিরুদ্ধে নতুন দখলের অভিযোগ, পুলিশের হাত থেকে আসামি ছিনতাই এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় ওসির অবহেলা—এসব প্রতিরোধের ঘাটতিও দেখায়।
কোথায় সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হলো, ৯৯৯-এর ডাকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কত পরোয়ানা কার্যকর হয়নি এবং আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ এসেছে—এই জবাব সরকারকে দিতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার কোনো সমাধান নয়। অনেক সময় দেখা গেছে জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাজে যুক্ত হয়েছে আবার কখনো কখনো ভুক্তভোগীকেই হুিমকি দিচ্ছে। তাই কার্যকরী ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬