Loading...

জনস্বাস্থ্য ও সড়ক নিরাপত্তা
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে দেশে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই মাসে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৩ জন—প্রায় তিন গুণ। হাম ও হামসন্দেহে মৃত্যুর সরকারি হিসাবও এই সময়ে বেড়েছে ১৩৫ জন। সংক্রমণ মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগের পাশাপাশি এই তুলনা সামনে আনছে আরেক প্রশ্ন। বছরজুড়ে সড়কে প্রাণহানি ঠেকানোর কাজ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে?


সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে দেশে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই মাসে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২৩ জন—প্রায় তিন গুণ। হাম ও হামসন্দেহে মৃত্যুর সরকারি হিসাবও এই সময়ে বেড়েছে ১৩৫ জন। সংক্রমণ মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগের পাশাপাশি এই তুলনা সামনে আনছে আরেক প্রশ্ন। বছরজুড়ে সড়কে প্রাণহানি ঠেকানোর কাজ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে?
রবিবার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত ও ৬৭৪ জন আহত হওয়ার তথ্য এসেছে। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৪ দশমিক ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হামের হিসাবটি নিশ্চিত ও সন্দেহজনক—দুই শ্রেণিতে প্রকাশ করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই দুই শ্রেণিতে মোট মৃত্যু ছিল ৯৭৩; ৩০ সেপ্টেম্বর তা হয় ১ হাজার ১০৮। দুই বিজ্ঞপ্তির পার্থক্য ধরে সেপ্টেম্বরের রিপোর্টে যুক্ত মৃত্যু ১৩৫। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে দুইজন এবং হামসন্দেহে ১৩৩ জন।
সেপ্টেম্বরের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় মাসে ৪২৩ জন এবং দিনে গড়ে ১৪.১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময় ডেঙ্গুতে মাসে ১৪৮ জন এবং দিনে গড়ে ৪.৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এই সময় নিশ্চিত হাম ও হামসন্দেহ মাসে ১৩৫ জনে এবং দিনে গড়ে ৪.৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বছরের হিসাবেও সড়কের নিয়মিত প্রাণহানি স্পষ্ট। একই সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে সড়কে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ওই বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৪১৩। প্রকাশিত দুই হিসাবের তুলনায় সড়কের মৃত্যু প্রায় ১৮ গুণ। শুধু সেপ্টেম্বরে নয়, গত বছরজুড়েই সড়ক ছিল প্রাণহানির বড় উৎস।

তবে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের প্রতিবেদনটি জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংস্থার নিজস্ব তথ্যনির্ভর। ডেঙ্গু ও হামের হিসাব আসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নজরদারি থেকে। ফলে এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় নথিভুক্ত মৃত্যুর তুলনা। পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিত্রের জন্য হাসপাতাল, পুলিশ ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্য যুক্ত করা প্রয়োজন।
সংক্রমণের দ্রুত বিস্তার ঠেকাতে জরুরি সাড়া এবং সড়কের ধারাবাহিক মৃত্যু কমাতে স্থায়ী ব্যবস্থা—দুটিই জনস্বাস্থ্যের দায়িত্ব।
হামের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক সাড়ার উদাহরণ রয়েছে। এপ্রিলে সরকার, ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সহায়তায় জরুরি হাম–রুবেলা টিকাদান শুরু হয়। প্রথম ধাপে ৩০ উপজেলায় ১২ লাখের বেশি শিশুকে সুরক্ষার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। টিকা, নজরদারি ও চিকিৎসার মতো সড়ক নিরাপত্তাতেও নির্দিষ্ট দায়িত্ব, অর্থায়ন এবং অগ্রগতি মাপার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সড়কের মৃত্যু নিয়ে আলোচনার ঘাটতির প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সড়ক নিরাপত্তা সাংবাদিকতা উদ্যোগ বলছে, সংকটের ব্যাপকতার তুলনায় পরিবর্তনের দাবিতে জনচাপ প্রায়ই কম থাকে। সংবাদে প্রাণঘাতী সংঘর্ষকে অনিবার্য দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানো এবং অবকাঠামো ও নিয়মের বদলে ব্যক্তির ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা এই সমস্যাকে বাড়ায়।
রোগের জাতীয় সংখ্যা প্রতিদিনের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে একত্রে আসে। সড়কের এই মাসিক হিসাব তৈরি হয়েছে বিভিন্ন স্থানের সংবাদ যোগ করে। সমন্বিত দৈনিক ও সাপ্তাহিক সড়ক-প্রাণহানির হিসাব প্রকাশে সংকটের ধারাবাহিকতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
এখানেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুসরণের জায়গা। কোথায় বারবার মানুষ মারা যাচ্ছে, গতিসীমা মানাতে কী ব্যবস্থা আছে, বিপজ্জনক মোড়ের নকশা বদলেছে কি না এবং আহত ব্যক্তি কত দ্রুত চিকিৎসা পেয়েছেন—এসব প্রশ্নকে নিয়মিত প্রতিবেদনে আনতে হবে। মাসিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব ফলের হিসাব যুক্ত করা দরকার।

সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে প্রতিরোধের ক্ষেত্রগুলোও স্পষ্ট। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন এবং পথচারী ১০৬ জন। আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে ১৭৮টি দুর্ঘটনা। নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনায় দুর্ঘটনার সংখ্যা ১৬৮, মোট ঘটনার ৩৮ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন অতিরিক্ত গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, চালকের অদক্ষতা এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রেখেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘নিরাপদ ব্যবস্থা’ ধারণা মানুষের ভুলের পরও প্রাণরক্ষার উপযোগী পরিবহনব্যবস্থা গড়তে বলে। এর ভিত্তি নিরাপদ সড়ক, গতি, যানবাহন ও সড়ক ব্যবহারকারী। ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গতি কমানো, মানসম্মত হেলমেট–সিটবেল্ট এবং কার্যকর যানবাহন পরীক্ষা এই কাঠামোর অংশ। সচেতনতার সঙ্গে নকশা ও আইন প্রয়োগের কাজও চলতে হবে।
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা এতিয়েন ক্রুগ বলেন, সড়কের মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য এবং সবাইকে নিরাপদ রাখার উপায় জানা আছে। বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয় জরুরি। পরিবহন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্বও তাই নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আহত মানুষের চিকিৎসাও তুলনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেপ্টেম্বরে সড়কে আহত ৬৭৪ জনের মধ্যে কারও দীর্ঘ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সংঘর্ষের পর চিকিৎসায় কয়েক মিনিটের বিলম্বও জীবন–মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সড়কের জন্য দ্রুত উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর সুফল রোগীরাও পাবেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দক্ষ চালক তৈরি, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস রোডের কথাও বলেছে। এসব সুপারিশের বাস্তবায়নসূচি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে জবাবদিহির সুযোগ তৈরি হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার বিস্তার রোধ, হামে টিকাদান এবং করোনায় সংক্রমণ মোকাবিলার গুরুত্বের সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার কাজও বছরজুড়ে এগোতে হবে। সেপ্টেম্বরের ৪২৩ মৃত্যু সেই প্রয়োজন মনে করিয়ে দেয়। সরকারের সাফল্য মাপতে প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাত কতটা কমেছে, জরুরি চিকিৎসা কতটা সহজ হয়েছে এবং কত পরিবার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পেয়েছে—এই ফলগুলো নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬