Loading...

বিমানের বহর সম্প্রসারণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজ সরবরাহ হয়নি। দুই ধাপে করা এসব চুক্তির প্রথম ১৪টির আনুমানিক তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ১১টির দাম ও অর্থায়নের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।


২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো উড়োজাহাজ সরবরাহ হয়নি। দুই ধাপে করা এসব চুক্তির প্রথম ১৪টির আনুমানিক তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ১১টির দাম ও অর্থায়নের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজের চুক্তি করেছে বিমান। এর মধ্যে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ছয়টি ৭৩৭-৮। এর আগে ৩০ এপ্রিল বিমান ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তি করে। সেই বহরে ছিল আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ও চারটি ৭৩৭-৮। সব মিলিয়ে নতুন অর্ডারে থাকছে ১৩টি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ও ১০টি ৭৩৭-৮।
২৫টি বোয়িং কেনার পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তখন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর উচ্চ পাল্টা শুল্কের আশঙ্কা ছিল এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে মার্কিন পণ্য আমদানি বাড়ানোর আলোচনা চলছিল। রয়টার্স সে সময় উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাকে ওই বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিতে অধিকাংশ বাংলাদেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারিত হয়।

বিমানের জন্য কতটা কার্যকর
বিমানের বর্তমান বহরের বড় অংশই বোয়িংয়ের। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে বহরে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, ৭৮৭-৮, ৭৮৭-৯ ও ৭৩৭-৮০০ রয়েছে। ফলে একই নির্মাতার আরও উড়োজাহাজ নেওয়ার একটি সুবিধা হচ্ছে প্রশিক্ষণ, প্রকৌশল সহায়তা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কিছু অবকাঠামো কাজে লাগানোর সুযোগ। বোয়িংও বলছে, নতুন ৭৮৭ ও ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের বিদ্যমান বোয়িং বহরের সঙ্গে পরিচালনগত সামঞ্জস্য বাড়াবে।
নতুন ৭৮৭-১০ উড়োজাহাজে দুই শ্রেণির বিন্যাসে সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৭৫ যাত্রী বহন করা যায় এবং সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৭ হাজার ৫০০ নটিক্যাল মাইল। বোয়িং জানিয়েছে, বিমান এগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বেশি যাত্রীচাপের রুটে ব্যবহার করতে চায়। অন্যদিকে ৭৮৭-৯-এর পাল্লা ৮ হাজার ৩০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত, যা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ রুটের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ৭৩৭-৮-এ সাধারণত ১৬০ থেকে ১৮০ যাত্রী এবং পাল্লা সাড়ে তিন হাজার নটিক্যাল মাইল; মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক রুটে এটি ব্যবহারযোগ্য।
বোয়িংয়ের দাবি, ৭৮৭ ও ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবার যেসব পুরোনো প্রজন্মের উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন করবে, সেগুলোর তুলনায় জ্বালানি ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত দক্ষতা দিতে পারে। তবে এই সাশ্রয়ের হিসাব নির্ভর করবে বিমানগুলো কোন রুটে চলবে, আসনের কত শতাংশ পূর্ণ থাকবে এবং সেগুলো পুরোনো বিমান প্রতিস্থাপন করবে নাকি কেবল বহরে নতুন সক্ষমতা যোগ করবে তার ওপর।
বাংলাদেশের বিমানযাত্রার বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির তথ্যও আছে। ২০২৫ সালে শুধু ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ১ কোটি ২৭ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করেছেন। একই অর্থবছরে বিমান ৩৩ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী বহন করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমানের রাজস্ব ছিল ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা এবং নিরীক্ষিত নিট মুনাফা ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা।
প্রথম ১৪টি বোয়িংয়ের আনুমানিক তালিকামূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এবং এগুলো অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক যুক্ত থাকার কথা জানানো হয়েছে। প্রথম ধাপেরগুলো ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং বাকিগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে পাওয়ার কথা। অর্থাৎ পুরো অর্থ একবারে পরিশোধের বিষয় নয়। কিন্তু ঋণের সুদ, ডাউনপেমেন্ট, প্রকৃত ছাড়, সরকারি গ্যারান্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যয় প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়মূল্য এখনো পরিষ্কার নয়। সর্বশেষ ১১টির ক্ষেত্রেও মোট মূল্য ও অর্থায়নের শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।

এয়ারবাস নিলে কী পাওয়া যেত
বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপের এয়ারবাসও বিমানকে চারটি এ৩৫০-৯০০ ও ছয়টি এ৩২১নিও কেনার নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি বিমানের কারিগরি ও আর্থিক কমিটি মূল্যায়ন করছে। ফরাসি রাষ্ট্রদূতও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, আলোচনা এখনো চলছে।
এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০-এর সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৮ হাজার ৬০০ নটিক্যাল মাইল, যা ৭৮৭-১০-এর ৭ হাজার ৫০০ নটিক্যাল মাইলের চেয়ে বেশি। ফলে কিছু দীর্ঘপাল্লার রুটে এ৩৫০ বেশি নমনীয়তা দিতে পারে। এ৩২১নিও পরিবারেও ৭৩৭-৮-এর তুলনায় বেশি আসন ও কিছু সংস্করণে বেশি পাল্লার বিকল্প আছে।
অন্যদিকে এয়ারবাস যুক্ত হলে নতুন পাইলট প্রশিক্ষণ, প্রকৌশলী, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। আবার এয়ারবাসের বক্তব্য হচ্ছে, বিমানের বর্তমান বিভিন্ন ধরনের বোয়িং উড়োজাহাজের মধ্যেও সম্পূর্ণ ককপিট ও ক্রু-কমনালিটি নেই। অর্থাৎ শুধু নির্মাতা এক হলেই সব পরিচালন ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে, এমন সরল হিসাবও নেই।
এর আগে ২০২৪ সালে এয়ারবাসের একটি ভিন্ন প্রস্তাব মূল্যায়ন করে বিমানের কমিটি আর্থিকভাবে লাভজনক নয় বলে মত দিয়েছিল। তবে সেটি ছিল আগের মূল্য, সংখ্যা ও শর্তের প্রস্তাব; ২০২৬ সালের নতুন ১০ বিমানের প্রস্তাবের সঙ্গে সেটিকে সরাসরি তুলনা করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত ২৫টি বোয়িং বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তার উত্তর নির্ভর করবে বিমানগুলোর প্রকৃত ক্রয়মূল্য, ঋণের শর্ত, রুটভিত্তিক যাত্রীচাহিদা, বিমান ব্যবহারের হার এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর। নতুন ১১টির ক্ষেত্রে এসব আর্থিক তথ্য এখনো প্রকাশ না হওয়ায় চুক্তির পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্যায়নও আপাতত সম্ভব নয়।
নবোদয়/ এসএন/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬